পেশাগত জীবনে একটা ব্যাপার আমি অবশ্যপালনীয় বলে মেনে এসেছি। খেলা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা থেকে সব সময়ই শত হস্ত দূরে থেকেছি। নির্দিষ্ট কোনো ম্যাচ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করায় তাও সাহস করা যায়। কিন্তু অঘটনপটিয়সী বিশ্বকাপ কে জিতবে, এই ভবিষ্যদ্বাণী করা! যারা করতে পারেন, তারা মহান। জেনেশুনে হাঁড়িকাঠে গলা পেতে দেওয়ার মধ্যে আমি কোনো বীরত্ব দেখি না।

কিন্তু এত বুঝেও লাভটা কী হলো! তা-ই তো দিতে হচ্ছে। বিশ্বকাপ বিশেষ সংখ্যায় অপরিহার্য এই মূল লেখাটা লিখতে আর কাউকে যে রাজি করানো গেল না! তা ছাড়া আমি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবল কভার করতে যাচ্ছি, ‘কে জিতবে’ এটা বলার দায়টা নাকি আমার ওপরই বর্তায়। আরে বাবা, কে জিতবে, এটা জানার জন্যই তো যাচ্ছি। ফিরে এসে না হয় বলি!

সেপ ব্ল্যাটার অবশ্য একটা এস্কেপ রুট দিয়ে রেখেছেন। ফিফা সভাপতি ঢাকা সফরে এসে করে গেছেন অমোঘ এক ভবিষ্যদ্বাণী। বিশ্বকাপ কে জিতবে? ব্ল্যাটারের উত্তর, ‘৯ জুলাইয়ের ম্যাচটিতে বিজয়ী দল।’ ৯ জুলাই বার্লিনে ফাইনাল, সেদিন যারা জিতবে, তারাই ২০০৬ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন। যত অঘটনই ঘটুক, এর কোনো নড়চড় হওয়ার উপায় নেই। ব্ল্যাটারের কত বুদ্ধি! এমনি এমনিই তো আর জাতিসংঘের চেয়েও বেশি সদস্য দেশবিশিষ্ট ফিফার সভাপতি হননি। যদিও ব্ল্যাটারের কথা উঠলেই আমার নাম না-জানা ওই জার্মান সাংবাদিকের কথা মনে পড়ে। ফিফার মহাসচিব থাকার সময় ব্ল্যাটার যখন গোলপোস্ট বড় করা, খেলোয়াড় সংখ্যা কমানোর মতো বৈপ্লবিক সব ধ্যানধারণা প্রবর্তন করার প্রস্তাব করছিলেন, ওই সাংবাদিক বলেছিলেন, ‘প্রতিদিন সকালে ব্ল্যাটারের মাথায় ১০১টি নতুন আইডিয়া আসে, তার মধ্যে ১০২টিই খারাপ।’


তবে বিশ্বকাপ-জয়ীর ভবিষ্যদ্বাণী করার ব্যাপারে সেপ ব্ল্যাটারের আইডিয়াটাকে ভালোই বলতে হবে। এবার এতটা নিরাপদ পথে না হাঁটলেও চলছে। প্রায় প্রতিবারই যেমন বিশ্বকাপ-পূর্ব ফেবারিটের নাম বলার সময়ই নানা মুনির নানা মতের দেখা মেলে, এবারের ঘটনা মোটেই তা নয়। এবার সব মুনিই একমত যে, ৯ জুলাই বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে আবারও কাফুর হাতেই উঠবে বিশ্বকাপ। সোনার কাপ যাবে ফুটবলের পারিজাত বাগান ব্রাজিলে। ‘হেক্সা’র আনন্দ ভাসিয়ে দেবে কোপাকাবানা সৈকত। এটা শুধু ব্রাজিলিয়ানদেরই কল্পনাবিলাস নয়, এমনকি ‘চিরশত্রু’ আর্জেন্টাইনরাও এবার ব্রাজিলের শিরোপা জয়ে কোনো সংশয় দেখছে না। সে দেশের ‘লা ন্যাশিওন’ পত্রিকার এক জরিপে শতকরা ৯০ ভাগ আর্জেন্টাইনের ব্রাজিলকে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন বলে রায় দিয়ে দেওয়াটাকে বিস্ময়কর বললেও পুরোটা বলা হয় না। বেকেনবাওয়ার-প্লাতিনির মতো সাবেক বিশ্বকাপ গ্রেটরাও তো ব্রাজিল ছাড়া আর কাউকে বিজয়মঞ্চে দেখতে পাচ্ছেন না। তার মানে কী দাঁড়াল! ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন ধরে নিয়ে কে রানার্সআপ হবে, তা নিয়েই আলোচনা করা?

সমস্যা হলো, বিশ্বকাপ ফুটবল এমন সরলীকরণে বিশ্বাস করে না। গত বিশ্বকাপের আগে জার্মান কোচ রুডি ফোলার ফেবারিটরা যে সব সময় বিশ্বকাপ জেতে না, তা বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি তা-ই জিতত, তাহলে ব্রাজিল ১৪ বার চ্যাম্পিয়ন হতো।’ তখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ হয়েছে ১৬টি, ফোলার ১৪ বার বলেছিলেন কেন? হয়তো ১৯৫৪ ও ১৯৭৪ বিশ্বকাপের কথা মনে রেখেই। হাঙ্গেরি ও হল্যান্ডকে চ্যাম্পিয়ন ধরে নিয়েই শুরু হয়েছিল সে দুটি বিশ্বকাপ। ’৫৪-তে পুসকাসের হাঙ্গেরি আর ’৭৪-এ ক্রুইফের হল্যান্ড যখন ফাইনালে উঠল, প্রতিপক্ষ ছাড়া বিশ্বের আর কেউ তাদের পরাজয় কামনা করেনি। কিন্তু দুবারই যে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল জার্মানি, যাদের এসব ভাবালুতায় ভেসে যাওয়ার অভ্যাস নেই। পুরো বিশ্বের মানুষের মন রাঙিয়ে দেওয়ার পরও দুই কিংবদন্তি পুসকাস ও ক্রুইফের কাছে বিশ্বকাপ তাই অধরাই হয়ে থেকেছে।