পত্রিকায় প্রকাশের তারিখ: ১২ জুলাই, ২০১৪। প্রথম আলো।

২০১৪ বিশ্বকাপ জিতবে কারা?

আবার কারা, ব্রাজিল। আরে ভাই, এটা কি কোনো প্রশ্ন হলো? আগের ১৯টি যেমন জিতেছে, এবারও ব্রাজিলই জিতবে। ১৯৩০ সালে সেই প্রথম বিশ্বকাপ থেকেই তো ছুটে চলেছে এই জয়রথ। সেবার ফাইনালে উরুগুয়েকে ৫-০ গোলে হারানোর পর দুই দেশে যুদ্ধ লেগে গিয়েছিল। নিজেদের দেশে পরাজয়ের জ্বালায় উরুগুইয়ানরা ঢুকে পড়েছিল ব্রাজিলের দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে। ব্রাজিলিয়ান সেনাবাহিনীর পাল্টা-আক্রমণে পালিয়ে বাঁচে।


১৯৩৪ ইতালি বিশ্বকাপ ফাইনালে ‘কালো হীরা’ লিওনিডাস ডা সিলভার সঙ্গে হাত মেলাতে হবে বলে মুসোলিনি আগেই স্টেডিয়াম ছেড়ে চলে যান। ব্রাজিলের শিরোপা ধরে রাখা ততক্ষণে নিশ্চিত হয়ে গেছে। চার বছর পর ফ্রান্সে ব্রাজিলের টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়।

বিশ্বযুদ্ধের কারণে এক যুগ বিরতির পর বিশ্বকাপ আবার শুরু হলো এই ব্রাজিলেই। ফাইনালে কি না উরুগুয়ে, যাদের সঙ্গে ফুটবল নিয়ে যুদ্ধবিগ্রহ পর্যন্ত হয়েছে। যুদ্ধে তো জিতেছিলই, মাঠেও ব্রাজিলই জিতল। ম্যাচ ১-১ চলার পর উরুগুইয়ান ফরোয়ার্ড গিঘিয়ার শট পোস্টে লেগে মাঠের অন্য অর্ধে চলে গেল। সেটি ধরেই অগাস্টো জয়সূচক গোলটি করলেন। দুই লাখের বেশি দর্শকের মারাকানায় তখন উৎসব আর উরুগুইয়ানরা সব অঝোরে কাঁদছে।

প্রতিটি বিশ্বকাপেই প্রতিপক্ষকে এমন কাঁদিয়ে এসেছে ব্রাজিল। আর ব্রাজিলিয়ান ফুটবলাররা উদ্ভাসিত হয়েছেন জয়ের হাসিতে। পেলে আর রোনালদো চারটি করে বিশ্বকাপ জিতেছেন। জিকো ও গারিঞ্চা তিনটি, কাকা ও লিওনিডাস দুটি।

কী, বিশ্বাস হচ্ছে না? সাও পাওলোর পাকেম্বু স্টেডিয়ামে মিউজি দো ফুটেবল ঘুরে এলে বিশ্বাস হতে বাধ্য। সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার, বিখ্যাত সব ফুটবলার সবাই তো এটাই বলছেন। শুধু মুখের কথায় বিশ্বাস না করতে চাইলে প্রামাণ্য ফুটেজও আছে।

ব্রাজিলিয়ানদের ফুটবলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন যে চার্লস মিলার, সাও পাওলো শহরের মাঝখানে তাঁর নামে বড় একটা চত্বর—প্রাকা চার্লস মিলার। ফুটবল-জাদুঘরটাও সেখানেই। যেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাস। ছবি-জার্সি-স্মারক-ঐতিহাসিক নানা নিদর্শন...জাদুঘরে যেসব থাকে, তা তো আছেই। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে দর্শনার্থীদের এর অংশ করে নেওয়ার ব্যবস্থাও আছে। বিখ্যাত সব খেলার ফুটেজ চলছে, চাইলেই দেখতে পারেন বিখ্যাত সব গোল...নেইমার পাস দেবেন আর আপনি গোল করবেন। হ্যাঁ, এটিও এখানে সম্ভব।

ব্রাজিলিয়ানদের জীবন-চিন্তা-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য হয়ে থাকা বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসও মূর্ত এখানে। ১৯৫৮ বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্যবহৃত বল, জুলে রিমে ট্রফির রেপ্লিকা, ছবিতে-কথায় প্রতিটি বিশ্বকাপের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। ফুটবল-বুটের বিবর্তনের গল্প ধরা আছে বিভিন্ন সময়ের বুটে—প্রথমটি সেই ১৯১৪ সালের। তিনতলার একটি ঘরে ‘মারাকানাজো’র সেই বিখ্যাত ফিল্মটি বিরতিহীন চলছে বড় পর্দায়। গিঘিয়া গোল করছেন, ভেঙে পড়া ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক বারবোসা সর্বস্ব হারানো মানুষের মতো ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছেন।