একটির জন্য ১৬ বছরের অপেক্ষা। অন্যটির জন্য ১৩ বছরের। ইংল্যান্ডের দুটি প্রার্থনাই যে একই সঙ্গে পূরণ হয়ে গেল, সেটিকে কাকতালীয় ভাববেন না। একটি যে আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কিতই।নতুন বোথাম’-এর জন্য ১৩ বছরের হাহাকার দূর হলো বলেই না অবসান ঘটল অ্যাশেজের আশায় ইংল্যান্ডের ১৬ বছরের অপেক্ষার।

যে সিরিজকে অনেকেই ‘সর্বকালের সেরা সিরিজ’-এর স্বীকৃতি দিয়ে ফেলছেন, তাতে কীর্তিমানের অভাব থাকবে না, সেটিই স্বাভাবিক। একজন কারো ব্যক্তিগত কৃতিত্ব তো আর সর্বকালের সেরা সিরিজের জন্ম দিতে পারে না। অ্যাশেজ-আকাশে তারা আছে তাই অনেকই, কিন্তু সূর্য একজনই। অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ—ইংল্যান্ডের ‘নতুন বোথাম’।


হ্যাঁ, হ্যাঁ, শেন ওয়ার্নের কথা মনে আছে। সিরিজে ৪০ উইকেটের পাশে ২৪৯ রান—অস্ট্রেলিয়া জিতলে‘সূর্য’বলতে হতো ওয়ার্নকেই। কিন্তু এই বিশ্ব তো শেষ পর্যন্ত বিজয়ীদেরই, এ কারণেই হতে হতেও শেন ওয়ার্ন অ্যাশেজ ২০০৫-এর মহানায়ক নন। সেই জায়গাটি অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফের।

আজ থেকে ১৩ বছর আগে শেষবারের মতো ইংল্যান্ডের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন ইয়ান বোথাম। এরপর মাঝের সময়টায় কতজনকে যে ‘নতুন বোথাম’ বলে ডাকা হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। অনেকে এর যোগ্যই ছিল না, দু-একজনের মধ্যে যা একটু প্রতিশ্রুতি ছিল, হয়তো এই‘নতুন বোথাম’নামের চাপেই সেটি আর পারফরম্যান্সে রূপ পায়নি। ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের আগে থেকেই এই তকমাটা লেগে গিয়েছিল ফ্লিনটফের গায়েও। শুরুর দিকের পারফরম্যান্স বলছিল, অন্তহীন‘নতুন বোথাম’-এর নামের মিছিলে হয়তো আরেকটি নামই শুধু যোগ হতে যাচ্ছে। সেটিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন ফ্লিনটফ আগেই। তবে তার পরও বোথামের সত্যিকার উত্তরাধিকারী হতে চূড়ান্ত পরীক্ষাটা ছিল এই অ্যাশেজ। অ্যাশেজে এবারই ফ্লিনটফের অভিষেক এবং সেই অভিষেকটা এমনই স্মরণীয় করে রাখলেন যে, ‘ফ্লিনটফের অ্যাশেজ’নামেই এটিকে মনে রাখবে ইংলিশরা। ১৯৮১ অ্যাশেজকে যেমন রেখেছে‘বোথামের অ্যাশেজ’ নামে।


৬ টেস্টের সিরিজে বোথাম রান করেছিলেন ৩৯৯, উইকেট নিয়েছিলেন ৩৪টি। এই পরিসংখ্যানই অনেক কিছু বলছে, আবার খুব সামান্যই বলতে পারছে। সেই সিরিজে যে পরিষ্কার দুটি ভাগ।

১৯৮১ সালে আর কিছু ঘটেনি, এমন নয়। তার পরও ইংল্যান্ডে ‘নাইনটিন এইটি ওয়ান’ বললেই যে কেউ বুঝে নেবে, আপনি ‘বোথামের অ্যাশেজ’-এর কথা বলছেন। ফ্লিনটফ কী করেছেন, সেই স্মৃতি তো একেবারেই টাটকা। বোথাম কী করেছিলেন, সেটি বরং মনে করিয়ে দেওয়া যাক। 

৬ টেস্টের সিরিজে বোথাম রান করেছিলেন ৩৯৯, উইকেট নিয়েছিলেন ৩৪টি। এই পরিসংখ্যানই অনেক কিছু বলছে, আবার খুব সামান্যই বলতে পারছে। সেই সিরিজে যে পরিষ্কার দুটি ভাগ। প্রথম দুই টেস্টে বোথামের ৩৪ রান আর ৬ উইকেট। শেষ ৪ টেস্টে ৩৬৫ রান, উইকেট ২৮টি। বোথাম নিজে মানতে রাজি নন, তবে নাটকীয় ওই পরিবর্তনে অধিনায়কত্বের ভূমিকা মেনে নিয়েছেন বাকি সবাই। প্রথম দুই টেস্টে বোথামই ছিলেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক। ট্রেন্টব্রিজে প্রথম টেস্টে ব্যাট হাতে ১ ও ৩৩ রানের পর দুই ইনিংসে ৩ উইকেট (২ ও ১)। ৪ উইকেটে হারল ইংল্যান্ড। লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টে বল হাতে ৩ উইকেট নিলেও ব্যাটিংয়ে বোথাম পেলেন ‘পেয়ার’। অধিনায়কত্ব যে তার জন্য অনুপ্রেরণা না হয়ে উল্টো বোঝায় পরিণত হয়েছে, ইংলিশ নির্বাচকদের এই  চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয় ওই‘পেয়ার’। তা বুঝতে পেরে নিজেই ওই কাঁটার মুকুট খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন বোথাম। প্রথম দুই টেস্টে দলের বাইরে থাকা মাইক ব্রিয়ারলিকে অধিনায়ক হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয় আবার। বাকিটুকু যেমন বলা হয়...ইতিহাস!


হেডিংলিতে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে দেখা দিলেন অন্য বোথাম। অন্য বোথাম কোথায়, অধিনায়কত্বের চাপে হারিয়ে গিয়েছিলেন যে বোথাম, সেই বোথামই তো! অস্ট্রেলিয়ার ৪০১ রানের প্রথম ইনিংসে ৯৫ রানে তার ৬ উইকেট। এরপর ইংল্যান্ডের ১৭৪ রানের প্রথম ইনিংসে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৫০। ফলোঅন করতে হলো ইংল্যান্ডকে।‘বোথাম-ম্যাজিক’-এর আসল প্রদর্শনীও তখনই। ১৩৫ রানে পড়ল ইংল্যান্ডের সপ্তম উইকেট, ইনিংস পরাজয় এড়াতেই তখনো প্রয়োজন ৯১ রানের। এরপর যা হলো, তা অভাবনীয়, অচিন্তনীয়, হয়তো অভূতপূর্বও। ১২ টেস্টের অধিনায়কত্ব ক্যারিয়ারে যে অপমান-লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হয়েছে, যেন তারই জবাব দিতে শুরু করল বোথামের ব্যাট। ক্ল্যাসিক্যাল ব্যাটসম্যানশিপের কোনো উদাহরণ এটি নয়। বরং রাগ-ক্ষোভ-বন্য আক্রমণাত্মকতা মিলেমিশে বোথামের ব্যাট থেকে যা বেরিয়ে এল, সেটির নাম হতে পারে একটাই—‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’। গ্রাহাম ডিলিকে সঙ্গী করে অষ্টম উইকেটে তুললেন ১১৭ রান, ক্রিস ওল্ডকে নিয়ে নবম উইকেটে ৬৭। মাত্র ৭৬ বলে এলো বোথামের সেঞ্চুরি। ৩৯ থেকে ১০৩ রানে গেলেন লাফিয়ে লাফিয়ে; ১৪টি চার, ১টি ছয় ও ২টি সিঙ্গেলে ভর করে। ৩৫৬ রানে ইংল্যান্ডের ইনিংস যখন শেষ হলো, বোথাম অপরাজিত ১৪৯ রানে। তার পরও জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ছিল মাত্র ১৩০ রানের, কিন্তু বোথামের ওই ইনিংসের ছটায় অস্ট্রেলিয়ানদের চোখ এমনই ধাঁধিয়ে গেল যে, ১১১ রানেই শেষ হয়ে গেল তারা। 

হেডিংলির ম্যান অব দ্য ম্যাচ যে বোথাম, তা না বললেও চলছে। এজবাস্টন ও ওল্ড ট্রাফোর্ডের পরের দুই টেস্টেও তা-ই। এজবাস্টনে ব্যাটিংয়ে ২৬ ও ৩ রান, বোথাম-ম্যাজিকের পুরোটাই এবার বোলিংয়ে। প্রথম ইনিংসে উইকেট পেয়েছিলেন একটিই, দ্বিতীয় ইনিংসে হাতে ৯ উইকেট ও ১৪২ রানের প্রয়োজন নিয়ে শেষ দিন শুরু করেছিল অস্ট্রেলিয়া। ৪৭ মিনিটে মাত্র ১৬ রানের মধ্যে শেষ ৬ উইকেট হারিয়ে তারা ১২১ রানে অলআউট। ২৮ বলের এক স্পেলে মাত্র ১ রান দিয়ে বোথাম নিলেন ৫ উইকেট!

‘বোথামের অ্যাশেজ’-এর সঙ্গে ‘ফ্লিনটফের অ্যাশেজ’-এর তুলনা করুন। সেবার ছিল ৬ টেস্ট, এবার ৫। ফ্লিনটফ উইকেট নিয়েছেন বোথামের চেয়ে ১০টি কম, তবে রান করেছেন ৩ বেশি। 

ওল্ড ট্রাফোর্ডে প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়ে যাওয়ার জ্বালা মেটালেন দ্বিতীয় ইনিংসে ১১৮ রান করে। ছয় মেরেছিলেন ৬টি, অ্যাশেজ সিরিজে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কা মারার এই রেকর্ডটি এবারই প্রথমে সমান করেছেন ফ্লিনটফ, পরে তা ভেঙেই দিয়েছেন কেভিন পিটারসেন। ওই সেঞ্চুরির সঙ্গে দুই ইনিংসে ৫ উইকেট, আবারও ম্যাচের সেরা বোথাম, আবারও ইংল্যান্ডের জয়। ইংল্যান্ডের অ্যাশেজ জয়ও নিশ্চিত হয়ে যায় তাতেই। এবারের মতো ১৯৮১ সালেও ওভালে শেষ টেস্টটি শেষ হয়েছিল ড্রতে। তাতে বোথামের ১০ উইকেট, সবচেয়ে কম সময়ে এবং সবচেয়ে কম বয়সে টেস্ট ক্রিকেটে ২০০ উইকেট নেওয়ার রেকর্ডটিও হলো সেই টেস্টেই। তবে টানা তিন টেস্টে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার পর এবার বোথামকে হার মানতে হলো ডেনিস লিলির (ম্যাচে ১১ উইকেট) কাছে।

এবার ‘বোথামের অ্যাশেজ’-এর সঙ্গে ‘ফ্লিনটফের অ্যাশেজ’-এর তুলনা করুন। সেবার ছিল ৬ টেস্ট, এবার ৫। ফ্লিনটফ উইকেট নিয়েছেন বোথামের চেয়ে ১০টি কম, তবে রান করেছেন ৩ বেশি। ইংল্যান্ডের পক্ষে ফ্লিনটফের চেয়ে বেশি রান মাত্র দুজনের (পিটারসেন ও ট্রেসকোথিক), বোলিংয়ে দ্বিতীয় স্থানে  থাকা সাইমন জোন্সের চেয়ে উইকেট বেশি ৬টি। ৫৭টি চার ও ৭টি ছয় মেরেছিলেন বোথাম, ফ্লিনটফ মেরেছেন ৪৯টি চার ও ১১টি ছয়।

কোথাও কোথাও তো ফ্লিনটফকেই এগিয়ে রাখতে হচ্ছে, তাই না? সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রাখতে হচ্ছে প্রতিপক্ষ বিবেচনায়। ১৯৮১ সালের অস্ট্রেলিয়া তো আর ২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার মতো আগের দেড় দশক ক্রিকেট বিশ্ব শাসন করে আসছিল না। ফ্লিনটফের সত্যিকার অর্থেই ‘নতুন বোথাম’ হয়ে ওঠায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা তাঁর বোলিংয়ের। এই সিরিজের আগ পর্যন্ত ব্যাটিং অলরাউন্ডার হিসেবেই পরিচিতি ছিল তাঁর। ব্যাটিং অলরাউন্ডার হরহামেশাই মেলে, বোলিং অলরাউন্ডারই ক্রিকেটের সেই বিরল প্রজাতি, যাঁর অপেক্ষায় দিন গোনে সব দল। এই সিরিজে সত্যিকার অর্থেই বোলিং অলরাউন্ডার হয়ে উঠেছেন অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ। গড়ে ঘণ্টায় ৯০ মাইল গতি, এর সঙ্গে প্রায় গুড লেংথ থেকে বল তোলার ক্ষমতা, রিভার্স সুইং... ফ্লিনটফ এখন শুধু বোলার হিসেবেই দলে আসার ক্ষমতা রাখেন। মিনি অলরাউন্ডারদের ভিড়ে মাঝে-মধ্যেই হয়তো আমরা ভুলে যাই, কিন্তু সত্যিকার অলরাউন্ডারের সংজ্ঞাটা তো এমনই--ব্যাটসম্যান-বোলার দুই ভূমিকাতেই দলে থাকার সামর্থ্য। এই বিবেচনায় যে কজনকে অলরাউন্ডার বলা যায়, সেই সংখ্যাটা এক হাতের আঙুলের কড় গুনেই শেষ করে ফেলা যায়। অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ তার মধ্যে অবশ্যই থাকবেন। 

এটাও নিশ্চিত যে. ‘নতুন বোথাম’ নামে আর খুব বেশি দিন ডাকা হবে না তাঁকে। বোথামের সঙ্গে মিল তো ক্রিকেটীয় সামর্থ্যেই শেষ। ব্যক্তিত্বের দিক থেকে দুজন একেবারেই ভিন্ন দুই মেরুর। মাঠের বাইরে নানা কাণ্ডকীর্তি মিলিয়ে বোথাম সব সময়ই ‘জীবনের চেয়েও বড়’ এক চরিত্র হয়ে ছিলেন। ফ্লিনটফ তা নন। কিছুটা অন্তর্মুখী। বোথামকে তাঁর অতি শত্রুও এই অপবাদ দেবে না), খেলোয়াড়ি ভদ্রতার প্রতিমূর্তি (এজবাস্টনে ২ রানে জয়ের পর সহ-খেলোয়াড়দের সঙ্গে উল্লাসে যোগ দেওয়ার আগে ব্রেট লিকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে গেছেন), নিজের সম্পর্কে বলতে গেলে লজ্জাই পান (বোথামের সঙ্গে যেকোনো তর্কে গেলে এক পর্যায়ে তিনি রেগেমেগে জিজ্ঞেস করেন, টেস্টে তুমি কয়টা উইকেট পেয়েছ শুনি!)। 

‘নতুন বোথাম’ হওয়ার কী দরকার! ফ্লিনটফ ফ্লিনটফই থাকুন না!