মানজারুল ইসলাম রানা কি এই ম্যাচটা দেখছিলেন? রহস্যময় অজানা যে ভূবনে চলে গেছেন তিনি, সেখানে কি ক্রিকেট-ফ্রিকেট নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়? সেই জগতের আর কেউ না ঘামালেও কেন যেন মনে হয়, ক্রিকেট অন্তপ্রাণ রানা ঠিকই কুইন্স পার্ক ওভালের দিকে তাকিয়ে ছিলেন কাল। 

ত্রিনিদাদের সেই কুইন্স পার্ক ওভালের দিকে, যেখানে বাংলাদেশের ক্রিকেটে যোগ হলো গৌরবের আরেকটি নতুন অধ্যায়। গত বিশ্বকাপের দুঃস্বপ্ন মুছে দিয়ে বাংলাদেশ দল ফিরিয়ে আনল ১৯৯৯ বিশ্বকাপের স্মৃতি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আপসেট হিসেবে ’৯৬ বিশ্বকাপে কেনিয়ার কাছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরাজয়ের পাশেই থাকে সেই বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়। কাল ভারতের বিপক্ষে ৫ উইকেটের জয়ও ক্রিকেটীয় বিচারে আপসেটই। কিন্তু যে আপসেটের পূর্বাভাস দেওয়া যায়, সেটিকে কি আর তেমন আপসেট বলা যায়? বাংলাদেশ দল তো এখানে আসার পর থেকেই বলে আসছিল, ভারত-শ্রীলঙ্কার ভয়ে একদমই কম্পিত নয় তাদের হৃদয়। নামে কী আসে যায়! মাঠে যারা ভালো খেলবে, তারাই জিতবে। 

তা ভালো বাংলাদেশ খেলল বটে। মাশরাফি-রাজ্জাক-রফিকের বোলিং, তামিম-সাকিব-মুশফিকের ব্যাটিং—এই ম্যাচের যা কিছু হাইলাইটস তার সবই তো বাংলাদেশের অবদান। ভারতের প্রবল পরাক্রান্ত ব্যাটিং লাইন আপ মাত্র ১৯১ রানেই শেষ। এরপর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের যে শুরুটা হলো, সেটি অনেককেই ফিরিয়ে নিয়ে গেল ১৯৯৬ বিশ্বকাপে। সে বিশ্বকাপের জয়াসুরিয়া যেন তরুণতর হয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং ওপেন করতে নামলেন। মাত্র ১৭ বছরের তামিম ইকবাল এক ইনিংসেই বদলে দিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্কে বাকি বিশ্বের ধারণা। জহির খানের ওভারের প্রথম বল হেলমেটে লাগল। জাতীয় দলে এসেছেন এই সেদিন, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ার্মআপ ম্যাচটি ছাড়া আর কোনো বড় দলের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা নেই। তামিম এরপর কী করতে পারেন? যা করলেন, তা এতদিন অন্য দেশের ব্যাটসম্যানদের করতে দেখে এসেছি আমরা। জহির খানের ওই ওভারেরই শেষ দুই বলে দুই বাউন্ডারি। শেষটি ডাউন দ্য উইকেট বেরিয়ে এসে।

ডাউন দ্য উইকেট তিনি অনেকবারই গেছেন। স্পিনারদের বলে নয়। জহির খান, আগারকার, মুনাফ প্যাটেলের বলে। ছক্কা খাওয়ার পর ‘পুঁচকে’ দলের ‘পুঁচকে’ এক খেলোয়াড়ের এমন দুবির্নীত আচরণে মুনাফ প্যাটেল খুব মাইন্ড করেছিলেন। প্রেসবক্স থেকে মনে হলো, কিছু বললেনও তামিমকে। আর তামিম, ১৭ বছরের তামিম, মাত্র পঞ্চম ওয়ানডে খেলতে নামা তামিম, মুনাফের চোখে চোখ রেখে ‘প্রীতি সম্ভাষণের’ উত্তর দিলেন।

 বিশ্বকাপ মিশনে রওনা হওয়ার আগের দিনও খুলনায় রানাদের বাড়িতে খেয়ে এসেছেন মাশরাফি। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন রানা। রানার বাবা মাশরাফিকে বলেন, তাঁর দ্বিতীয় ছেলে। গত পরশু প্র্যাকটিসে এসে মাশরাফি ধরা গলায় এ কথা বলছেন, তাঁর গায়ে তখন জ্বর।

দলকে ২৪ রানে রেখে শাহরিয়ার নাফীসের আউট হয়ে যাওয়া এ কারণেই বাংলাদেশের গায়ে লাগেনি। গায়ে লাগেনি তামিম আউট হওয়ার ১০ রানের মধ্যে আফতাবের বিদায়ও। রানরেট নিয়ে যে একটুও ভাবতে হচ্ছিল না। মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসানের ৮৪ রানের চতুর্থ উইকেট জুটি ম্যাচের ফলাফল নিয়েও আর কাউকে ভাবতে দিল না।

তামিম এমনই খেলেন, এটা সবারই জানা ছিল। কিন্তু মুশফিকুর রহিম এমন খেলতে পারেন, কজন জানত তা? স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্ট খেলেছেন, তাঁর ব্যাটিং সামর্থ্য নিয়ে তাই কোনো সংশয় নেই। বিশ্বকাপের দলেও এসেছেন মূলত ব্যাটিংয়ের কারণেই। সবই ঠিক আছে। কিন্তু হরভজন আর যুবরাজের বলে যেভাবে দুটি ছক্কা মারলেন, সেই মুশফিকুরকে কজন চিনত! খালেদ মাসুদ বাদ পড়ায় যত হইচই হয়েছে, তার পুরো চাপটাই পড়েছে তাঁর ওপর। তিন নম্বরে নামা মুশফিকুর অপরাজিত ৫৬ রান করে বুঝিয়ে দিলেন, এই সব চাপ-টাপ তাঁর অভিধানে নেই। তিনি অন্য ধাতুতে গড়া। জয়সূচক রানটা তাঁর ব্যাট থেকেই এসেছে। তা-ই আসা উচিত ছিল। মাঝখানে সাকিব আল হাসান খেলে গেছেন ৫৩ রানের এক ইনিংস। তামিম-সাকিব-মুশফিক—ওয়ানডে ইতিহাসের আর কোনো এমন কম বয়সী হাফ সেঞ্চুরিয়ান দেখেছে বলে মনে হয় না।


খেলা শুরুর আগে দু দল সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রানার স্মৃতিতে এক মিনিট নীরবতা পালন করেছে। বাংলাদেশ দল নেমেছে কালো আর্মব্যান্ড পরে। দুই আম্পায়ারও তা-ই। না থেকেও তাই ছিলেন রানা। এই ম্যাচে রানার জন্য খেলবে বলে জানিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ দল। তা বলার সময় ৪৯.৩ ওভারে ভারত ১৯১ রানে অলআউট হয়ে যাবে—মনে হয় না হাবিবুল বাশার এতটা ভাবতে পেরেছিলেন। ব্যাটসম্যানরা যা শেষ করেছেন,  সেটি তাই বোলারদের গড়ে দেওয়া ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই। 

রানার মুখে সব সময় হাসি থাকত। কাল ত্রিনিদাদের কুইন্স পার্ক ওভালে বাংলাদেশ যা করেছে, তাতে সেই হাসিটা আরও বড় হওয়ার কথা। শুধু আমরা তা দেখতে পাচ্ছি না। কেউই পাচ্ছে না কে বলল! রানার মুখে হাসি ফোটানোর প্রতিজ্ঞা নিয়েই তো কাল মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ। ৭ ওভারের মধ্যে বীরেন্দর শেবাগ আর রবিন উথাপ্পাকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর মাশরাফি বিন মুর্তজার চোখে কী ভেসেছে—রানার হাসিমুখই তো! 

বিশ্বকাপ মিশনে রওনা হওয়ার আগের দিনও খুলনায় রানাদের বাড়িতে খেয়ে এসেছেন মাশরাফি। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন রানা। রানার বাবা মাশরাফিকে বলেন, তাঁর দ্বিতীয় ছেলে। গত পরশু প্র্যাকটিসে এসে মাশরাফি ধরা গলায় এ কথা বলছেন, তাঁর গায়ে তখন জ্বর। সেই জ্বর গায়ে নিয়েই কাল মাশরাফি রীতিমতো কাঁপন তুলে দিলেন ভারতের বিখ্যাত ব্যাটিং লাইন আপে। ৭ ওভারের প্রথম স্পেলে ২০ রান দিয়ে ২ উইকেট। দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে মাশরাফিই শেষ করেছেন ভারতের ইনিংস। ৯.৩ ওভারে ৩৮ রান দিয়ে ৪ উইকেট। 

দু দিন আগে ভারতের এক সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় ভারতের ব্যাটিং লাইনআপকে বিশ্বসেরার স্বীকৃতি দিয়েছেন মাশরাফি। ওই সাংবাদিক বারবার প্রশ্ন করেছেন, কী বলছেন? অস্ট্রেলিয়ার চেয়েও ভালো? মাশরাফি তাঁর মতে অনড়, ‘অস্ট্রেলিয়ার শুধু পন্টিং-গিলক্রিস্ট ভালো। ভারতের সবাই।’ পরিসংখ্যানেও মাশরাফির কথার সমর্থন মিলবে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ভারতই প্রথম দল, যে দলে তিনজন দশ হাজারী ব্যাটসম্যান। তাঁদেরই একজন, সৌরভ গাঙ্গুলীই যা কিছুক্ষণ ভারতের আশা আর বাংলাদেশের গলার কাঁটা হয়ে টিকে ছিলেন বাংলাদেশের বোলারদের তোপ সামলে। 

বাকি দু জন—শচীন টেন্ডুলকার ও রাহুল দ্রাবিড় করেছেন ৭ ও ১৪। সেটিও কাঁপতে কাঁপতে। হাজার হাজার রানের আত্মবিশ্বাসের ছিঁটেফোটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি তাঁদের ব্যাটিংয়ে। মাশরাফি ও রাসেলের প্রথম স্পেলে সৌরভও অনেকবারই নিতান্তই সৌভাগ্যক্রমে বেঁচেছেন। উইকেটে টেন্ডুলকার-সৌরভ, আর পাওয়ার প্লেতে মেডেন হচ্ছে—অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতের ম্যাচেও এটা খুব সহজদৃষ্ট নয়। পাওয়ার প্লের ২০ ওভারে ভারতের রান মাত্র ৬০—এটাই বা খুব বেশি দেখা গেছে কই!

বীরেন্দর শেবাগের দিনকাল অনেক দিনই ভালো যাচ্ছে না। প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশকে পেয়ে হয়তো ভেবেছিলেন, ফর্মে ফেরার ভালো সুযোগ। ষষ্ঠ বলেই সেই ভাবনার সমাপ্তি। মাশরাফির ভেতরে ঢোকা বল শেবাগের ব্যাটে লেগে এলোমেলো করে দিল স্টাম্প। পরের উইকেট উথাপ্পা, মাশরাফিকে ড্রাইভ করতে গিয়ে ক্যাচ দিলেন পয়েন্টে। সেটি ইনিংসের সপ্তম ওভার, ভারতের রান ২১। ম্যান অব দ্য ম্যাচ মাশরাফির বোলিং ফিগার তখন: ৩.৪-১-১৫-২।

নতুন বলে তাঁর সঙ্গী সৈয়দ রাসেল কোনো উইকেট পাননি। তাতে কি আসে যায়! অ্যান্ডি রবার্টস সেদিন বলছিলেন, এখন ওয়ানডেতে বোলাররা বড় বেশি উইকেট নেওয়ার চেষ্টা করে। তাঁদের রণনীতি ছিল রান আটকে রাখা। তাহলেই ব্যাটসম্যান ভুল করতে বাধ্য। রাসেলের বোলিং দেখলে রবার্টস বড় খুশি হতেন। টানা ১০ ওভার করেছেন। দুটি মেডেন, রান দিয়েছেন ৩১। শুধু একটা ওভারই বাজে বোলিং করেছেন, অষ্টম ওভারে দিয়েছেন ১০ রান। উইকেট যে পাননি, তা নিছকই দুর্ভাগ্য।

ত্রিনিদাদে খেলা বলে বাংলাদেশের একটু মন খারাপই হয়েছিল। দলে তিন জন বাঁহাতি স্পিনার, আর ভারতীয় ও শ্রীলঙ্কানরা চোখ বন্ধ করেও স্পিন খেলতে পারে। অথচ কাল বাংলাদেশের দুই বাঁহাতি স্পিনার রাজ্জাক ও রফিকও আনপ্লেয়েবল হয়ে গেলেন! দু জনেরই ৩টি করে উইকেট। মিল প্রথম ওভারে উইকেট নেওয়াতেও। রফিক তো প্রথম বলেই। দ্রাবিড় এলবিডব্লু রফিক ৭। টেন্ডুলকার রাজ্জাকের আর্মারে বোকা বনে ব্যাট-প্যাড হয়ে ক্যাচ দিলেন উইকেটের পেছনে। 

২৫তম ওভারে ৪ উইকেটে ৭২—তারপরও ভয় ছিলই। ভারতের এত লম্বা ব্যাটিং লাইন আপ, কেউ না কেউ কি রুখে দাঁড়াবে না? আরেক বাঁহাতি যুবরাজ সিংকে সঙ্গী করে তা-ই দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলী। পঞ্চম উইকেট জুটিতে দু জনের ৮৩ রানের জুটির সময় প্রথমবারের মতো কিছু বিগ শটও দেখা গেল। বাংলাদেশের দুই বাঁহাতি স্পিনারের বিপক্ষে দুই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান, এরপর আছেন ধোনি। ম্যাচে প্রথমবারের মতো একটু দুশ্চিন্তায় পড়েছিল বাংলাদেশ। পরের আট বলেই তা উধাও। ওই তিন জনই যে নেই! যুবরাজকে আউট করলেন রাজ্জাক। পরের ওভারে রফিক চার বলের মধ্যে ফিরিয়ে দিলেন সৌরভ ও ধোনি দু জনকেই। রাজ্জাকের পরের ওভারে হরভজনের উইকেট। মাশরাফি আক্রমনে ফিরে পরপর দু ওভারে তুলে নিলেন হরভজন ও আগারকারকে। ১৬ বলের মধ্যে ২ রান যোগ করতে ভারতের ৫ উইকেট নেই!

ম্যাচটা তখনই বাংলাদেশের হয়ে গিয়েছিল। আর এই বাংলাদেশ দল হাত থেকে ম্যাচ ফেলে দেওয়ার দল নয়। প্রথম বল থেকে ম্যাচের শেষ বল পর্যন্ত বাংলাদেশ যা খেলল, তা সত্যিকার এক পেশাদার পারফরম্যান্স।

পরপারে মানজারুল ইসলাম রানার মুখের হাসিটা আরও চওড়া করে দেওয়ার মতোই।