পত্রিকায় প্রকাশের তারিখ: ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১১। প্রথম আলো।

ক্রিকেটের গায়ে রং লেগেছে অনেক দিনই। আলোর রোশনাই-ও ওয়ানডে ক্রিকেটের অপরিহার্য অনুষঙ্গ প্রায় একই সময় থেকে। ক্রিকেট ব্যাট আর বলের খেলা হতে পারে, কিন্তু ক্রিকেটের বিশ্বকাপ আলো আর রঙেরও কি নয়! ২০১১ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের যাত্রাও শুরু হলো তাই আলো আর রঙে মাখামাখি এক সন্ধ্যা দিয়েই।

উইকেটে প্রথম বল পড়ার আগে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হয় না। সেই অর্থে এই উদ্বোধন নিছকই আনুষ্ঠানিকতা। বিশ্বকাপের আসল উদ্বোধন তো আগামীকাল বেলা আড়াইটায়। যখন পুরো বাংলাদেশ রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে থাকবে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের দিকে। বাংলাদেশের ১১ ক্রিকেট-সেনানী মাঠে নামবেন ভারতকে চ্যালেঞ্জ জানাতে।


কাল রাতে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে দুই ঘণ্টার বেশি দীর্ঘ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে আকাশ আলো করে তোলা আতশবাজি তা হলে কী বার্তা ছড়িয়ে দিল? ছড়িয়ে দিল আসলে আমন্ত্রণ। ৪৩ দিনের ক্রিকেট মহাযজ্ঞের আমন্ত্রণ।

তিন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আয়োজিত এই বিশ্বকাপের একটা আনুষ্ঠানিক সূচনা-মুহূর্ত প্রয়োজন ছিল। ১৪ দলকে একই পতাকাতলে দাঁড় করানোর প্রথম ও শেষ সুযোগও ছিল এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। গত দুটি বিশ্বকাপের মতো ১৪ দলকে দাঁড় করানো যায়নি এখানে। অধিনায়কদের প্রতীকী উপস্থিতিই জানিয়ে দিল—এটা ক্রিকেটের মহামিলনমেলা।

অধিনায়কেরা মাঠে ঢুকলেন আলোর মালা পরা রিকশা চড়ে। সবার আগে রিকি পন্টিং। সবার শেষে স্বাগতিক তিন দেশের ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ। অনুমিতভাবেই সবচেয়ে বেশি হর্ষধ্বনিটা উঠল সাকিব আল হাসানের নাম ঘোষিত হওয়ার পর। হাজার মানুষের ‘বাংলাদেশ’ ‘বাংলাদেশ’ চিত্কার যেন প্রতিযোগিতায় নামল সাকিবদের শুভকামনা জানাতে।


বিসিবি সভাপতি, ক্রীড়ামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও আইসিসি সভাপতির বক্তৃতাপর্বের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে বিশ্বকাপের উদ্বোধন ঘোষণা করলেন, সেটি সত্যিকার অর্থেই ‘ডিজিটাল উদ্বোধন’। স্ক্যানারে হাত রাখতেই শুরু হয়ে গেল আতশবাজি। আকাশে উড়তে শুরু করল রংবেরঙের ঘুড়ি। শিল্পব্যাংকের গায়ে পর্দায় ফুটে উঠল বিশ্বকাপের প্রতিচ্ছবি। সেটিই রূপ বদলে হয়ে গেল ২২ গজি উইকেট আর মাঠের সবুজ জমিন। সেখানে দেয়ালে ঝুলে থাকা ‘স্পাইডারম্যানরা’ এক ওভার ক্রিকেটও খেলে ফেললেন! শেষ বলে ছক্কা, বল বাইরে যেতে যেতে হয়ে গেল বিশ্বকাপের লোগো।

পুরো অনুষ্ঠানে ক্রিকেটের ছাপ বলতে গেলে শুধু এটুকুই। অনুষ্ঠানের শেষের বাঁশি বাজাতে শঙ্কর-এহসান-লয় যখন ‘দে ঘুমাকে’ নিয়ে মঞ্চে উঠলেন, তখন আবার যেন বাজল ক্রিকেটের সুর। মাঝখানে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের মঞ্চ কখনো শ্রীলঙ্কান রূপ নিল, কখনো বা ভারতীয়, সবচেয়ে বেশি সময় ধরে চিরন্তন বাংলাদেশের। স্বাগতিক তিন দেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতি ফুটে উঠল নাচে-গানে। 


বায়ান্ন থেকে একাত্তর—বাংলাদেশের বাংলাদেশ হয়ে ওঠার দীর্ঘ ইতিহাসও। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে শুরু হচ্ছে এই বিশ্বকাপ। সেটি মূর্ত হয়ে উঠল বাংলাদেশ পর্বে বর্ণমালা নিয়ে বর্ণমেলাতে। অ-আ-ক-খ হাতে যেন ভাষাসৈনিকেরা। ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ যেমন ভাষা আন্দোলনের সূচনার কথা বলল, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ জানিয়ে দিল সেই আন্দোলনের পরিণতি পাওয়ার গল্পও। বায়ান্নর হাত ধরেই একাত্তর। সেই একাত্তর এল বড় পর্দায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ছবিতে।

এ দেশের দুই সংগীত কিংবদন্তি সাবিনা ইয়াসমীন ও রুনা লায়লা গাইলেন। মাঝখানে দর্শক মাতাতে মঞ্চে এলেন মমতাজও। ব্রায়ান অ্যাডামস বড় আকর্ষণ হয়ে ছিলেন এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের। তিনি এলেন তাই সবার শেষে। তিন দেশের সংস্কৃতি ফুটিয়ে তোলা কোরিওগ্রাফি, সাবিনা-রুনা-মমতাজ, এর সঙ্গে আবার ব্রায়ান অ্যাডামস—নানা রঙের সব ফুল মিলে সুন্দর একটা ফুলের তোড়া হয়ে উঠল কি না, এই প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কাছে কতটুকু প্রত্যাশা থাকা উচিত, এই প্রশ্নও তো এখনো মীমাংসিত নয়। অলিম্পিক বা যেকোনো গেমসের উদ্বোধনী-সমাপনী অনুষ্ঠান যেমন কখনো কখনো আসল খেলার চেয়ে আলোচিত হয়ে ওঠে, ক্রিকেট বা ফুটবল বিশ্বকাপ তা কখনোই নয়।


তবে কাজের কাজটা ঠিকই করেছে কালকের এই আলো আর রঙের মেলা। ক্রিকেট-বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পেরেছে বিশ্বকাপের আগমনী সংগীত। সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষের ক্রিকেট প্রেমের বার্তা। কাল সকাল থেকে ঢাকা শহরের সব পথ যেন মিশল এসে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। তবে সব পথের শেষটা স্টেডিয়ামে প্রবেশদ্বারের সঙ্গে মিলল না। স্টেডিয়ামের ভেতরে যখন বিশ্বকাপের আবাহন, বাইরে তখন হাজারো মানুষ। বড় পর্দায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা সম্প্রচারের ব্যবস্থা করলে দুধের স্বাদ অন্তত ঘোলে মেটাতে পারত তারা। সেই কথা কারও মাথায় আসেনি। বাঙালির বিশ্বকাপ-উন্মাদনা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে ঘিরেই এমন তুঙ্গে উঠে যাবে, এটা হয়তো কল্পনাতেও আসেনি কারোর।

স্টেডিয়ামের বাইরে মানুষের মেলায় তারস্বরে ভুভুজেলা বেজে গেল। বিশাল এক লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে শুধু শুধুই ছুটে বেড়াল কিছু কিশোর-তরুণ। বিদেশি সাংবাদিকেরা দেখলেন আর বিস্ময়ে চোখ তুললেন কপালে। সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠে ‘সারা বিশ্বের বিস্ময়...’ যেন এটিরই গীতিরূপ হয়ে অনুরণন তুলল সবার হূদয়ে। বাংলাদেশকে ‘তুমি আমার অহংকার’ বলার উপলক্ষ মনে হচ্ছে এনেই দেবে এই বিশ্বকাপ!