‘একটি জয়’, ‘একটি জয়’ করে প্রায় পাঁচ বছরের যে হাহাকার, অবশেষে তার সমাপ্তি হলো। ’৯৯ বিশ্বকাপে নর্দাম্পটনের সেই ম্যাচের স্মৃতি রোমন্থ’ন করেই কাটাতে হয়েছে এই পৌনে পাঁচ বছর। এখন আর তার প্রয়োজন পড়ছে না। পাঁচ বছর পেছনে যাওয়ার কী প্রয়োজন, হারারে আছে না!

মুলতান টেস্টের পর রাওয়ালপিন্ডি ওয়ানডে-পাকিস্তান সফরে যে জয় ধরা দিতে দিতেও মরীচিকার মতো হারিয়ে গেছে, কাল স্বপ্নের সেই জয় ধরা দিল হারারেতে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৮ রানের সেই জয়ের পর বাংলাদেশের খেলোয়াডেরা ছোট্ট শিশু-কিশোরের মতো লাফিয়ে বেড়ালেন হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে। এতদিন নত মস্তকে অন্য দলের এমন উৎসবের দৃশ্য দেখে এসেছে বাংলাদেশ দল, কাল পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে দর্শক বানিয়ে নিজেরাই মেতে উঠল উৎসবে। মাঠের সেই উদযাপন শেষে যখন ড্রেসিরুমে ফেরার পালা, তখন অদ্ভুত সুন্দর এক দৃশ্য। খেলোয়াড়দের অনেকেরই চোখে টলমল করছে জল, অথচ মুখে হাসি। কান্না তো শুধু দুঃখেরই বহিঃপ্রকাশ নয়, তীব্রতম আনন্দেরও। এর চেয়ে তীব্রতম আনন্দের উপলক্ষ তো আর আসেনি!


গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা তো এই যে, শেষ ৪ বলে ১৩ রান প্রয়োজন ছিল জিম্বাবুয়ের, তারেক আজিজ ৪ রানের বেশি নিতে দেননি।

বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় কেউ আশাই করেনি। সেটি ছিল তাই বাড়তি পাওনা। কিন্তু টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর সেই জয় পরিণত হয়েছিল দাবিতে। পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই জয়ের পর জিম্বাবুয়ে সফরের আগ পর্যন্ত ৪৭টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ, দুটিতে বৃষ্টির কল্যানে পরাজয় এড়ানো গেছে, হারতে হয়েছে বাকি ৪৫টিতেই। এই রেকর্ড নিয়ে হাসাহাসির দিন ফুরলো এতদিনে।

বুলাওয়েতে বৃষ্টির কারণে ঘরে বন্দি মোহাম্মদ আশরাফুল একদিন বলছিলেন, ‘আমরা ম্যাচের পর ম্যাচ হেরেই চলেছি। তারপরও বাংলাদেশের মানুষ আমাদের যে কী সম্মান করে! আমি শুধু ভাবি, একটা ম্যাচ যদি আমরা জিতে যাই, তাহলে বাংলাদেশের মানুষ কী করবে।’

শুধু ভেবেই থেমে থাকেননি আশরাফুল, বাংলাদেশকে প্রায় ভুলে যাওয়া জয়ের স্বাদ দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটাও রাখলেন তিনি। মাত্র ৩২ বলে তার অপরাজিত ৫২ রানের ইনিংসটিই গড়ে দিয়েছে ব্যবধান, ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিটি ছিল শুধুই আনুষ্ঠানিকতা। আশরাফুলের আগে অধিনায়ক হাবিবুল বাশার যোগ্য নেতার মতো নেতৃত্ব দিলেন সামনে থেকে। অধিনায়কত্বে তাঁর ডেপুটি রাজিন সালেহ, কাল মাঠেও তিনি ডেপুটির ভূমিকায়। অধিনায়ক আর সহ-অধিনায়কের ১১৪ রানের জুটি যে ভিত্তিটা গড়ে দিয়েছিল, তার ওপরে দাঁড়িয়েই না অমন খেলতে পারলেন আশরাফুল!

তারপরও ২৩৮ এমন কোনো স্কোর নয়। পরপর দুই বলে বার্নি রজার্সের ক্যাচ ফেলে সেটিকে আরো অপর্যাপ্ত বানিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। ২২তম ওভারে জিম্বাবুয়ে ১ উইকেটে ১২১, হারারেতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন সূর্যোদয় হবে, তখন তা কল্পনাও করা যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশ হাল ছাড়েনি। উইকেটের পর উইকেট তুলে নিয়েছে, ফিল্ডাররা জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে রান বাঁচিয়েছেন, তড়তড় করে বেড়েছে জিম্বাবুয়ের আস্কিং রেট। 

তারপরও শেষ ওভারে এসে দেখা গেল, জিম্বাবুয়ের প্রয়োজন মাত্র ১৩ রান। মাত্রই, শেষ ওভারে ১৩ রান করে ওয়ানডে ম্যাচ জেতার ইতিহাস এত লম্বা যে, ভয় ছিলই। কে করবেন এই শেষ ওভার? ‘হিরো’ হওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি ভিলেন হয়ে যাওয়ার ভয়। মাত্র ষষ্ঠ ম্যাচ খেলতে নামা তারেক আজিজ ঝাঁপ দিলেন সেই অগ্নিপরীক্ষায়। 

তারপর...তারপর যা হলো, তা দিয়ে রূপকথা লেখা হয়। প্রথম দুই বলেই তারেক বোল্ড করে দিলেন মাত্সকেনেরি আর হন্ডোকে। হ্যাটট্রিকের সামনে দাঁড়িয়ে তারেক আজিজ! সেই হ্যাটট্রিক হয়নি, কিন্তু হ্যাটট্রিক নিয়ে তখন কে ভাবে!

গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা তো এই যে, শেষ ৪ বলে ১৩ রান প্রয়োজন ছিল জিম্বাবুয়ের, তারেক আজিজ ৪ রানের বেশি নিতে দেননি। উৎসবে মেতে ওঠার জন্য শেষ বল পর্যন্ত অপেক্ষাও করতে হয়নি। শেষ বলে প্রয়োজন ১০ রান, নো আর ওয়াইড যাতে না হয়, শুধু সেটিই নিশ্চিত করতে হতো। তারেক তা করেছেন।

হারারে আর বুলাওয়েতে বাংলাদেশ যে হোটেলে আছে, দুটির লবিতেই বড় একটা হোর্ডিং। ওয়েলকাম টু বেঙ্গল টাইগার্স! বাংলাদেশ দলকে এখন তো ‘টাইগার্স’ বলাই যায়!