ম্যাচ যখন শেষ হলো, ঘড়িতে রাত ২টা ৪৩। প্রেজেন্টেশন দেখেটেখে বিছানায় যেতে যেতে আরও মিনিট পনেরো। ভোর পর্যন্ত শুধুই এপাশ-ওপাশ। দিনটা শুরু হয়েছিল আর দশটা দিনের চেয়ে অনেক আগে। তারপরও ঘুমের দেখা নেই। ঘণ্টাখানেক আগেও ক্লান্ত-শিথিল স্নায়ুগুলো যে তখন উত্তেজনার ছোঁয়ায় রীতিমতো কাঁপছে! তা সেই ছোঁয়াটা কে দিলেন? নিউজিল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচটা দেখে থাকলে উত্তরটা আপনি জানেন। কার্লোস ব্রাফেট!

একসময়ের শখটা পেশার দায়ের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে প্রায় তিন দশক। এ কারণেই কি না,  খেলা দেখে উত্তেজিত-রোমাঞ্চিত হওয়ার অনুভূতিটা প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল। প্রেসবক্সের বাইরে শুধুই দর্শকের ভূমিকায় প্রত্যাবর্তনই কি তাহলে ফিরিয়ে নিয়ে গেল প্রায় ভুলে যেতে বসা সেই সময়টাতে! ম্যাচ শেষ হওয়ার অনেকক্ষণ পরও জাগিয়ে রাখল সেটির রোমাঞ্চ!

গত পরশু বেলা সাড়ে তিনটায় শুরু প্রথম ম্যাচটাতেও ক্লাসিক হওয়ার প্রায় সব উপাদানই ছিল। আফগানিস্তান জিতলে আপসেটের সৌরভে সেটি পূর্ণতা পেত। নাকি শেষ ওভারে মোহাম্মদ শামির হ্যাটট্রিক আরও বেশি স্মরণীয় করে রাখল ম্যাচটাকে! আগের দিন শ্রীলঙ্কার কাছে ইংল্যান্ডের হেরে যাওয়াতেও উচ্চকিত হয়ে উঠেছে খেলার সেই চিরন্তন আকর্ষণ—যা ভাবা যায়নি, তা হয়ে যেতে পারে; যা ঘটার কথা নয়, তা ঘটে যেতে পারে। এককথায় প্রকাশ করলে ‘অভাবনীয়’ আর ‘অঘটন’ বললেই চলে।

জীবন যেমন বীর খোঁজে, খেলাও তো তা-ই। অসম্ভবের সাগরে একা তরি বেয়ে তীরে পৌঁছে যাওয়ার বীরত্বের চেয়ে কাব্যগাথার আদর্শ উপাদান আর কীই-বা হতে পারে। তীরের একেবারে কাছে এসে তরি ডুবে গেলেই বা কী! ‘ট্র্যাজিক হিরো’র আবেদনও কি কম!

ক্রিকেট বিশ্বকাপের স্বমহিমায় দেখা দেওয়ার পর্বটাও যেন অদৃশ্য কারও লেখা পাণ্ডুলিপি নিখুঁত অনুসরণ করে। অর্কেস্ট্রায় মিউজিক যেমন ক্রেসেন্ডোর পথ বেয়ে একসময় ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছায়, শ্রীলঙ্কা-ইংল্যান্ড আর ভারত-আফগানিস্তান ম্যাচ দুটি যেন সেই ক্রেসেন্ডো আর নিউজিল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচটি ক্লাইম্যাক্স। আহা, কী ম্যাচটাই না হলো! কী লড়াইটাই না করলেন কার্লোস ব্রাফেট! 

১৬৪ রানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৭ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর একবার ভেবেছিলাম, এই ম্যাচ দেখে আর কী লাভ! ঘুমিয়ে পড়াই ভালো। অনেকেই এই ভাবনাটাকে কাজে রূপান্তর করেছেন বলেই ধারণা। তাঁদের জন্য একটু দুঃখই হচ্ছে। কী মিসটাই করেছেন! এখন পর্যন্ত এই বিশ্বকাপের সেরা ম্যাচ, বিশ্বকাপ শেষেও যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাতেও অবাক হব না। টেলিভিশনে খেলা রিপিট হয়, হাইলাইটস তো দেখা যায় যখন ইচ্ছা—কিন্তু কার্লোস ব্রাফেটের ওই অসম্ভবকে ধাওয়া করা সরাসরি দেখার শিহরণ সেখানে কীভাবে খুঁজে পাওয়া সম্ভব!

পরের বলের জন্য অপেক্ষা করার সময় হেলমেটের গ্রিলে ঢাকা দৈত্যাকার ব্রাফেটের ওই জ্বলজ্বলে চোখ, একটু হাঁ করা মুখ। যেন রোমান গ্ল্যাডিয়েটর। শেষ তিন উইকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের তোলা ১২২ রানের ৮৭-ই তাঁর ব্যাট থেকে। ম্যাচ যখন শুধুই তিনের মামলা—৩ ওভারে চাই ৩৩—তখন ম্যাট হেনরির প্রথম পাঁচ বল থেকে ২, ৬, ৬, ৬, ৪। শেষ বলে সিঙ্গেল নিয়ে স্ট্রাইকে আবার ব্রাফেট। নিজের রান ৯৯, জয় থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ মাত্র ৮ রান দূরে। ২ ওভারে ৮, কোনো ব্যাপার নাকি! তার ওপর ‘একটা উইকেটই তো চাই’ ভাবতে ভাবতে তূণের আসল দুই তির বোল্ট আর ফার্গুসনের কোটা শেষ করে ফেলেছেন কেন উইলিয়ামসন।

বাধ্য হয়ে তাঁকে বল তুলে দিতে হয়েছে জিমি নিশামের হাতে। প্রথম বলটি অফ স্টাম্পের বাইরে বাউন্সার, যেটি ব্রাফেটকে পেরিয়ে যেতেই কমেন্ট্রি বক্স থেকে ইয়ান বিশপ বললেন, ‘নো সিক্স!’ যেন ছয় না হওয়াটাই ঘটনা, হওয়াটা নয়। তিন বছর আগে কলকাতায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালের অবিস্মরণীয় সেই শেষ অঙ্কেও কমেন্ট্রি বক্সে ছিলেন বিশপ। শেষ ওভারে লাগত ১৯ রান, বেন স্টোকসের প্রথম চার বলেই ছক্কা মেরে ব্রাফেট ম্যাচ শেষ করে দেওয়ার পর তাঁর কথাটা এখনো অনুরণন তোলে—রিমেম্বার দ্য নেম। সেই ম্যাচে আমি প্রেসবক্সে, যেখানে টেলিভিশনের ভলিউম ‘মিউট’ করা থাকে। বিশপের ওই কথাটা স্বকর্ণে তাই পরে শুনেছি। মাঝের তিন বছরে ব্রাফেট বলার মতো কিছুই করতে পারেননি বলে বিশপের ওই ‘রিমেম্বার দ্য নেম’ কথাটা উল্টো বিদ্রূপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এদিন যেন ব্রাফেট প্রতিজ্ঞা করেছেন, ম্যানচেস্টারে ফিরিয়ে আনবেন কলকাতাকে, ইডেন গার্ডেনকে ওল্ড ট্রাফোর্ডে। স্টোকসও দেখলাম টুইট করেছেন, ‘...ভেবেছিলাম ২০১৬ কলকাতা ফিরে আসবে।’

আর একটা ছয়েই যখন লেখা হয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়,  সেটি মারতে গিয়েই লং অনে ক্যাচ। একমাত্র নিউজিল্যান্ডাররা ছাড়া বিশ্বের বাকি কেউ তা চেয়েছিলেন বলে মনে হয় না। হতাশায় হাঁটু গেড়ে উবু হয়ে মাঠে বসে ব্রাফেট। তাৎক্ষণিক উল্লাস শেষে নিউজিল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা ছুটে এলেন তাঁর দিকে। কেউ পিঠে হাতে রাখলেন, কেউবা মেলালেন হাত। অভিনন্দন জানালেন না সান্ত্বনা, বোঝা মুশকিল! হয়তো দুটিই।

ভাঙা শোনাচ্ছে বিশপের গলা। কমেন্ট্রি বক্সে তাঁর সঙ্গী ব্রেন্ডন ম্যাককালামেরও তা-ই। যা হলো, তা নিয়ে তাঁকে কিছু বলতে বললেন বিশপ। কীভাবে এর বর্ণনা করবেন, তা বুঝতে না পারার অক্ষমতার কথা জানিয়ে ম্যাককালাম বললেন, ‘আজ কোনো একজনের জয়ের আনন্দে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে মাঠ থেকে বেরোনোর অধিকার থেকে থাকলে সেটি ছিল কার্লোস ব্রাফেটের।’

ম্যাককালামের এই কথা দিয়েই লেখাটা শেষ করে দেওয়া ভালো মনে হচ্ছে। দুটি বাক্যই শুধু যোগ করতে চাই।

ধন্যবাদ কার্লোস ব্রাফেট। হারিয়ে যাওয়া দর্শক-মনটা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।