এডসন সিলভা ডিডোর সঙ্গে অটো ফিস্টার, সামির শাকির, জর্জ কোটান বা আন্দ্রেস ক্রুসিয়ানির যদি হঠাৎ দেখা হয়ে যায়! কী আলোচনা করবেন তাঁরা? 

যাঁদের নাম লেখা হলো, তাঁদের মধ্যে যোগসূত্র একটাই। দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁরা সবাই বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের কোচ ছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমেই! না, বাংলাদেশ বিশ্ব ফুটবলের তলানিতে পড়ে থাকা এক দেশ বলে নয়। সেটি তো যাঁরা আসেন, জেনেশুনেই আসেন। আসার পর তাঁদের যা জানতে হয়, তা থেকেই তাঁদের নিজেকে‘দুর্ভাগা’ ভাবার শুরু। পেশাদার কোচ বাংলাদেশে পা রাখার কয়েক দিনের মধ্যেই টের পেয়ে যান,‘পেশাদারিত্ব’শব্দটা এ দেশের ফুটবলে শুধুই কথার কথা। শুনতে খুব ভালো শোনায় বলে প্রায়ই উচ্চারিত হয়। কিন্তু আসলে এটি চরম অপেশাদারিত্বের এক ফুটবল-দেশ। 

এই জানায় যেমন বাংলাদেশ দলের সব বিদেশি কোচের মিল, তেমনি মিল যাওয়ার সময়ের উপলব্ধিতেও। যে উপলব্ধির কথা গত পরশু প্রথম আলোর সতীর্থ সাংবাদিককে বলেছেন ডিডো—‘এ দেশে ফুটবল নিয়ে কেউ ভাবে না। কেউ না...।’

পূর্বসূরি আর সবার মতো ডিডোর কাছেও বাংলাদেশ তাই তিক্ত এক স্মৃতি হয়েই থাকবে। যে স্মৃতির কথা তিনি ভুলেই যেতে চাইবেন। যেমন চেয়েছেন অটো ফিস্টার। ঘানার মতো আফ্রিকার অনেক দেশে অটো ফিস্টার প্রায় ঈশ্বরের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। বাংলাদেশের অনেক ভাগ্য যে, মুফতে তাঁর মতো একজন কোচকে পেয়ে গিয়েছিল। গত বিশ্বকাপে সেই ফিস্টার টোগোর কোচ। কোলনে ফ্রান্স-টোগোর ম্যাচ শেষে মিনিট দুয়েক কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। বিশ্বকাপ নিয়ে এটা-ওটা বলার পর বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে কী একটা প্রশ্ন করতেই ফিস্টার‘বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না’বলে উল্টোপথে হাঁটা শুরু করলেন। কোটান-ক্রুসিয়ানিদেরও এমনই করার কথা। ভবিষ্যতে করবেন হয়তো ডিডোও। 

বাংলাদেশের ফুটবলে কেন বিদেশি কোচদের কাছে এমন বিস্মরণযোগ্য তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রতিশব্দ—এ দেশের ফুটবল কর্তাব্যক্তিরা কি কখনো তা ভেবে দেখেছেন? ভাবার অবশ্য প্রয়োজন পড়ছে না, কারণটা যে তাঁরাই। বাংলাদেশে বিদেশি কোচ আসার কিছুদিনের মধ্যেই অবধারিত যে ঘটনাটি ঘটে তা হলো, বাফুফের কিছু কর্তাব্যক্তি—যাঁদের মধ্যে সাবেক খেলোয়াড়েরই সংখ্যাধিক্য—লেগে যান কোচের পেছনে। কোচের এই খারাপ, ওই খারাপ...। এসব সবচেয়ে বেশি শোনা যায় জাতীয় দল নির্বাচনের সময়। কারণ কোচ যে তাঁদের ‘পরামর্শ’ শুনতে রাজি নন। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কোনো পেশাদার কোচ কেনই বা তা শুনবেন?

ফুটবল অন্য খেলার মতো নয়। এক বেসবল ছাড়া আর কোনো খেলায় কোচ এমন সর্বেসর্বা নন। ফুটবলে এটাও চিরন্তন রীতি যে, কোচই এখানে‘ওয়ানম্যান সিলেকশন কমিটি’। একক বিবেচনায় দল গড়বেন, যাকে ইচ্ছা-যেমন ইচ্ছা ফর্মেশনে খেলাবেন। প্রথম কোন কোচ কথাটা বলেছিলেন, এ নিয়ে বিতর্ক আছে বলে অনেকের নামেই চালু আছে গল্পটা। দেশের প্রেসিডেন্ট তাঁর পছন্দের কোনো খেলোয়াড়কে দলে নিতে বলছেন আর কোচ জবাব দিচ্ছেন—‘আপনি এখানে নাক গলাতে আসছেন কেন? আমি তো আপনার কেবিনেট নির্বাচন করতে যাই না।’ 

কোচ নির্বাচন বাফুফের এখতিয়ার। যত ইচ্ছা যাচাই-বাছাই হোক তখন। কিন্তু সেটি চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর মানতে হবে, কোচই চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। ডিডোকে অনেক স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল—কথাটা এমনভাবে বলা হচ্ছে, যেন এটা দয়াদাক্ষিণ্যের ব্যাপার। আসলে তো তা নয়। দল নির্বাচনে স্বাধীনতা কোচের অধিকার।

একক দায়িত্ব বলেই ঝুঁকিটাও বড়। ফুটবলে ব্যর্থতার প্রথম বলি হতে হয় কোচকেই। সেই যে একটা কথা আছে—‘কোচ দু ধরনের হয়। কেউ বরখাস্ত হয়েছে, কেউ বা বরখাস্ত হওয়ার অপেক্ষায়’—কথাটা ফুটবল কোচদের ক্ষেত্রেই বেশি প্রযোজ্য। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন যে বলেছেন,‘কোচ আসবে-যাবে, এটাই রীতি’—কথাটায় তাই কোনো ভুল নেই।

সমস্যা হলো, ডিডোর বিদায়ের কারণটায় সেই রীতিতে ভিন্ন একটা মাত্রা যোগ হওয়া। ব্যর্থ হলে বেশির ভাগ সময়ই কোচের চাকরি যায়, কিন্তু নির্বাচিত দল কর্তাদের পছন্দ হয়নি বলে চাকরি যাওয়ার ঘটনাটা বোধহয় একটা বিশ্ব রেকর্ডই! যে বিশ্ব রেকর্ড করার আনন্দে বগল বাজাতে পারেন বাফুফের কর্তাব্যক্তিরা।

কোনো দল নির্বাচনই সবার মনঃপূত হয় না। দল নির্বাচন আর বিতর্ক হাত ধরাধরি করেই চলে। ডিডোর দল নিয়েও বিতর্ক ছিল। হয়তো একটু বেশিই ছিল। কিন্তু সেই দল মেনে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাফুফে যে ডিগবাজিটা খেল, সেটিও তো ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক সংযোজন। সংবাদ সম্মেলনে যে বাদল রায় সপারিষদ ঘোষণা করেছিলেন, নির্বাচিত দল নিয়ে তাঁদের দ্বিমত থাকলেও ফুটবলে কোচের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে তাঁরা তা মেনে নিচ্ছেন; তিনিই আবার কীভাবে ডিগবাজি খেলেন!

ডিডোর নির্বাচিত দল সাফ ফুটবলে সফল হতো কি হতো না, এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের কখনোই জানা হবে না। আরও কিছু প্রশ্নের উত্তরও যেমন বাফুফের কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে কখনোই পাওয়া যাবে না। এই যে বলা হলো, দল ব্যর্থ হলে কোচ তো চলেই যাবেন, বাফুফে কর্তাদের তো জবাব দিতে হবে। প্রশ্ন নাম্বার এক—বাংলাদেশ ব্যর্থ হলে (ব্যতিক্রমীভাবে কখনো কখনো সফল হলেও!) সব সময় তো কোচেরই চাকরি গেছে। কবে কখন বাফুফে কর্তাদের কেউ পদত্যাগ করেছেন? প্রশ্ন নাম্বার দুই—ডিডোর নির্বাচিত দলে কী কী ভুল ছিল, সে ব্যাপারে জাতীয় দল ব্যবস্থাপনা কমিটি যদি এতই নিঃসন্দেহ হবে, তা হলে সেই পরিবর্তনগুলো করে ২৩ সদস্যের দল ঘোষণা করা হলো না কেন? কেন আবার ৩২ জন খেলোয়াড়কে ক্যাম্পে ডেকে শুরু হলো‘কেঁচে গণ্ডূষের’প্রক্রিয়া? প্রশ্ন নাম্বার তিন—বাংলাদেশের ফুটবলের সমস্যা ও সমাধানের উপায় নিয়ে কিছুদিন আগে ডিডো যে বিশদ প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছেন, বাফুফের কজন সদস্য তা পড়ে দেখেছেন?

শেষ প্রশ্নের উত্তরটা অবশ্য জর্জ কোটান দিতে পারবেন। তিনিও অনেক খেটেখুটে এমন একটা রিপোর্ট জমা দিয়েছিলেন। এর পর দিন যায়, মাস যায়...সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা হলেই কোটান অভিনয় করে দেখাতে শুরু করেন,‘আমার রিপোর্টটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে ফেডারেশন কর্তারা চা-টা খেয়ে গল্পগুজব করে চলে যান।’

গত পরশু প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে ডিডোর বরখাস্ত হওয়ার খবরটার নিচে অনেক পাঠক মন্তব্য করেছেন। একজন তুলেছেন খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন—শৃঙ্খলাগত কারণে যাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের ফিরিয়ে এনে তরুণ খেলোয়াড়দের কী বার্তা দেওয়া হলো? কোচের কথা না মানলেও কিছু আসে-যায় না, এটাই তো!

বাফুফের অবশ্য এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ভাবার সময় কই! ডিডোকে একটা শিক্ষা দিতে হতো, সেটি দিয়ে তাঁরা আত্মতৃপ্তির হাসি হাসছেন—'আমাদের সঙ্গে গোয়ার্তুমি! হু হু।’আজ প্রথম আলোর অনলাইন জরিপে শতকরা ৭৯ ভাগই যে ডিডোকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটাকে অযৌক্তিক বলে রায় দিয়েছেন, তাতেই বা তাঁদের কী এসে-যায়!

আরেকটা প্রশ্ন দিয়েই শেষ হোক—২৩ জনের একটা দলও ঠিকমতো নির্বাচন করতে পারেন না সিদ্ধান্তে পৌঁছে ডিডোকে তো অযোগ্য বলেই ঘোষণা করল বাফুফে। এই‘অযোগ্য’লোকটার হাতে বাংলাদেশের ফুটবলকে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটা যাঁরা নিয়েছিলেন, তাঁদেরও কি পদত্যাগ করা উচিত নয়?