ক্লিয়ার শ্যাম্পুর দেখা যাচ্ছে অনেক গুণ! এটি ব্যবহারে শুধু চুলই পরিষ্কার হয় না, এল ক্লাসিকোও দেখা যায়!

‘অবিশ্বাস্য হইলেও সত্যি’ কথাটার একসময় খুব চল ছিল বাংলায়। এমন সব ক্ষেত্রেই এটি ব্যবহূত হতো। না ভাই, সাংবাদিকতা ছেড়ে ইউনিলিভারে চাকরি নিয়েছি ভাববেন না। আমি সাংবাদিকতাই করছি। যা ঘটেছে, ঘটছে বা ঘটতে যাচ্ছে—তা বলাই তো সাংবাদিকের কাজ, তাই না?

যা ঘটেছে, সেটি আগে বলে নিই। ক্লিয়ার শ্যাম্পু কিনে এল ক্লাসিকো দেখার সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশের সৌভাগ্যবান যে ১২ জন, তাঁদের সফরসঙ্গী হয়ে গত শুক্রবার বিকেলে মাদ্রিদে পা রেখেছি। 

ওই ১২ জনের মধ্যে অনেকের এটাই প্রথম বিদেশ সফর। দেশের বাইরে প্রথমেই ইউরোপে, তা-ও আবার এল ক্লাসিকো দেখতে! মণিকাঞ্চন যোগ বোধ হয় একেই বলে!

একটা ক্ষেত্রে অবশ্য আমিও বাকি সবার সঙ্গে এক বিন্দুতে মিলে যাচ্ছি। মাঠে বসে এল ক্লাসিকো তো আমিও দেখিনি। বিমানে ওঠার সময় অবশ্য সেই রোমাঞ্চের বদলে বিরক্তিই বেশি ঘিরে ছিল। সফরটা হওয়ার কথা ছিল গত অক্টোবরে। বিজয়ীদের ভিসা-জটিলতায় সেটি পাঁচ মাস পিছিয়ে ন্যু ক্যাম্পের বদলে গন্তব্য হয়ে গেল বার্নাব্যু। যেটি চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই আসলে বিরক্তির শুরু। দেশে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ ফেলে এটা কি এল ক্লাসিকো স্বপ্নপূরণের সময় নাকি!


গত দুই দিনে সেই বিরক্তি অনেকটাই উধাও। অভূতপূর্ব একটা অভিজ্ঞতার সঙ্গে যে পরিচয় করিয়ে দিল এই সফর। যত না সাংবাদিক, তার চেয়ে বেশি পর্যটক হয়ে যাওয়ার ঘটনা তো এর আগে ঘটেনি! কোনো সফরে এসে দুই দিন পর লিখতে বসার ঘটনাও তো এই জনমে এটাই প্রথম। 

মাদ্রিদে এসে দুই দিন যেমন ঘুরে বেড়ালাম, ক্রিকেট কাভার করতে এক মাসের সফরেও খুব কমই তা পেরেছি। শনিবার সকালে পুরো দল মিলে গিয়েছিলাম মাদ্রিদ থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরের টলেডোতে। ইউরোপের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি। যেটিকে অনন্য করে তুলেছে মুসলিম, খ্রিষ্ট ও ইহুদি সংস্কৃতির মেলবন্ধন। ইউনেসকো তো আর অকারণে এটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সিটি বলে ঘোষণা করেনি। অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ছিমছাম নিরিবিলি টলেডো মুগ্ধ করল ঠিকই, তবে নানা ঢঙের বিশালাকার সব স্থাপনা দেখে একটুও আফসোসও হলো। স্থাপত্য নিয়ে একটু পড়াশোনা থাকলে মুগ্ধতাটা বোধ হয় আরও বাড়ত।

হাতে সময় বেশি নেই। মাদ্রিদ শহরটা দেখার জন্য একটা ‘সিটি ট্যুর’ নেব বলে ভাবছিলাম। শেষে ঠিক করলাম, হণ্টনই ভালো। যেকোনো শহরকে ভালোভাবে বুঝতে পদযুগলের চেয়ে বড় সহায় আর হয় না। তাতে কষ্ট হবে। হলোই বা। এখানে তো স্টেডিয়ামে দৌড়ানোর দায় আর লেখা পাঠানোর তাড়া নেই। টলেডো থেকে দুপুর-দুপুর ফিরে গভীর রাত পর্যন্ত তাই মাদ্রিদ চষে বেড়ালাম। পর্যটকদের অবশ্যদ্রষ্টব্য সবই মোটামুটি দেখা হয়ে গেল।

‘দেখতেই হবে’ এই তালিকার শীর্ষে থাকা ‘গুয়ের্নিকা’ (স্প্যানিশ উচ্চারণে বোধ হয় ‘গুর্নিকা’) দিয়েই শুরু। রেইনা সোফিয়া জাদুঘরে পিকাসোর অমর সৃষ্টির সামনে যে অনেকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তা জেনে আমাকে বিরাট কোনো শিল্পবোদ্ধা ভেবে বসবেন না। অসংখ্যবার ছবিতে দেখা কোনো চিত্রকর্মের ‘অরিজিনাল’ রূপের সামনে দাঁড়ালে যে কারোরই অমন হওয়ার কথা। 

‘গুয়ের্নিকা’ দ্রোহের ছবি। প্রতিবাদের ছবি। কী আশ্চর্য, সেটির রেশ নিয়ে জাদুঘর থেকে বেরোতেই দ্রোহ আর প্রতিবাদের বাস্তব এক প্রদর্শনীর সামনে! মাদ্রিদের প্রাণকেন্দ্র পোয়ের্তা দেল সলে হাতে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড আর মুখে প্রতিবাদী স্লোগান নিয়ে হাজার হাজার মানুষ। তাতে মধ্যবয়সী আছে, প্রৌঢ় আছে, প্যারাম্বুলেটরে ছোট্ট শিশুকে নিয়ে আছে পুরো পরিবার আর তরুণেরা তো আছেনই। মাদ্রিদে পা রাখার পরই শুনেছিলাম, শনিবার এক মহাজমায়েত হতে যাচ্ছে এই শহরে। গত দুই সপ্তাহ স্পেনের নানা প্রান্ত থেকে বাসে-ট্রেনে-হেঁটে স্রোতের মতো মানুষ আসছে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির প্রতিবাদ জানাতে। সেই প্রতিবাদের প্রকাশ নানাভাবে হলো। একটা জায়গায় দেখলাম, সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে কী একটা গান গাইছে। যা দেখে ২০১৩ ফেব্রুয়ারির শাহবাগের কথা মনে পড়ে গেল।


এখানে অবশ্য কারও ফাঁসি-টাসির দাবি নেই। স্পেনের অর্থনীতিতে ভয়াবহ আর্থিক মন্দা কাটাতে গণহারে ছাঁটাই চলছে, বেতন কমে অর্ধেক হয়ে গেছে অনেকের, বাজেটে বরাদ্দ কমেছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। বেকারত্বের হার ২৬ শতাংশ, ইউরোপে যেটি গ্রিসের পর সর্বোচ্চ। ২৫ বছরের কম বয়সী অর্ধেকেরই কোনো কাজ নেই। তরুণদের অনেকেই বাধ্য হয়ে তাই অন্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। সেই ক্ষোভেরই উদিগরণ ওই সমাবেশ।

ক্ষোভে-প্রতিবাদে উত্তাল সেই জনসমুদ্র পাড়ি দিয়ে একটু দূরে এসে দোকানে দোকানে ঘুরে টুকটাক কেনাকাটা করছি। কিছুক্ষণ পর একটা স্পোর্টস শপ থেকে বেরিয়ে দেখি, একটু আগে যেখানে ছিল শুধু মানুষ আর মানুষ, সেখানে এখন চক্কর দিতে থাকা পুলিশের গাড়ি ছাড়া আর কিছু নেই। ওই সমাবেশের যে প্রীতিকর সমাপ্তি হয়নি, তখনই অনুমান করেছিলাম। রাতে সবকিছু জেনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আর কিছুক্ষণ ওখানে থাকলেই তো বিদেশ-বিভুঁইয়ে এসে মহাবিপদে পড়ে যেতাম! ওখান থেকে চলে আসার একটু পরই রীতিমতো লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে সেখানে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের দিকে মুখোশ পরা কিছু তরুণের পাথর আর আতশবাজি ছোড়ার মাধ্যমে যেটির শুরু। এর পর যা যা হয়েছে, বাংলাদেশে তা দেখে আমরা খুবই অভ্যস্ত। পুলিশের কাঁদানে গ্যাস আর রাবার বুলেট ছোড়া, ২৯ জন গ্রেপ্তার, পুলিশ আর প্রতিবাদকারী মিলিয়ে শতাধিক আহত।

রাত ৯টায় শুরু এল ক্লাসিকো দেখতে হোটেল থেকে বেরোব ৭টায়। এর আগে আরেকটু ঘুরব-টুরব। ভাবলাম, লেখাটা শেষ করেই বেরোই। কিন্তু কী লিখতে চেয়েছিলাম আর কী লিখলাম! শুরু করার সময় ভেবেছিলাম, এতে এল ক্লাসিকোর আগের মাদ্রিদ অভিজ্ঞতার কথাই বেশি থাকবে। স্পোর্টস শপে দোকানদারের সঙ্গে রিয়াল-বার্সা নিয়ে মজার কথোপকথনটা তো অবশ্যই। কিন্তু লেখার টানে কোথায় যে চলে গেলাম!