খেলা শেষ হওয়ার আগেই ইতালির সবাই ওভাবে মাঠে ঢুকে পড়ল! অনেকেরই বুঝতে একটু সময় লাগল, গোলের বাঁশি আর ম্যাচ শেষ হওয়ার বাঁশিটা একই সঙ্গে বেজেছে। ডর্টমুন্ড স্টেডিয়ামের মাথার ওপর অদ্ভুত কালচে নীল রঙা আকাশে তখন ঠিক অর্ধেকটা চাঁদ। তার নিচে জার্মানরা কাঁদছে।

মাইকেল বালাক মাথা নিচু করে বসে। তাঁর চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে শুয়ে অনেকে। মাঠের অর্ধেকটায় আনন্দে উন্মাতাল ইতালিয়ানদের দিকে তাকাতে তাকাতে ক্লিন্সমান এক-এক করে হাত রাখলেন সবার পিঠে। বালাক জার্সি তুলে চোখ মুছলেন।

নীল রঙের ছোট্ট একটা অংশ শুধু নেচে যাচ্ছে, বাকি গ্যালারি নিশ্চুপ। দু মিনিটের ওই নাটকটা ‘নাটকীয়তা’ শব্দটাকেও এমনই অপর্যাপ্ত মনে করাচ্ছে যে, দুঃখ-শোক-বিহ্বলতার চেয়েও বেশি অবিশ্বাস। আসলেই কী এমন হলো! ফুটবল এমন নিষ্ঠুর হতে পারে!

স্টেডিয়ামের বিশাল পর্দায় ক্লোজআপে ধরল এক জার্মান মেয়েকে। দু গালে সোনালি-লাল-কালো আঁকা, গলায় একই রঙের মালা, গায়ে সাদা জার্সি, যার বাঁ পাশে তিনটি তারকা। তিনটিই থাকবে! দু চোখে অঝোর জলের ধারা, মূর্তির মতো নিষ্কম্প ওই মেয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে। এমন শূন্যদৃষ্টি আর দেখিনি।


প্রেসবক্স থেকে একটু নেমে এসেছি। পাশেই জার্মানরা পতাকা গোটাচ্ছে। স্মরণকালে কেউ জার্মানিতে জাতীয় পতাকা নিয়ে এমন মাতামাতি দেখেনি। অন্তর্মুখী, অহংকারী, দাম্ভিক, যন্ত্রসুলভ জার্মানদের মধ্যে এত আবেগ লুকিয়ে ছিল, তারা নিজেরাই যে তা জানত না! নিজেদের নতুন করে চেনানোর সেই বিশ্বকাপ শেষ! গলায় ঝোলানো অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেখে পাশে দাঁড়ানো বৃদ্ধ জার্মান নিজে থেকেই বলেন, ‘আমরা এক স্বপ্নের ঘোরে ছিলাম। সব শেষ হয়ে গেল!'

আর তিনি তখন ড্রেসিরুমে ঢোকার টানেলের মুখে। সতীর্থরা যখন শুয়ে-বসে ছিল, সান্ত্বনা দিয়েছেন তাঁদের। পুরো দল মাঠে ঘুরতে শুরু করতেই একা উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করলেন অলিভার কান। গত বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের বিশ্বকাপ এবার শুরুই হয়নি। শেষ হলো সবার সঙ্গেই। নাতি-নাতনিদের সঙ্গে গল্প করার সময় এই বিশ্বকাপটার কথা কি কান গোপনই করে যাবেন!

স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে মিডিয়া সেন্টারের দিকে হাঁটি। পাশে জনস্রোত। স্তব্ধ জনস্রোত। রেলওয়ে স্টেশনে এসেও দেখি, সারি সারি বিষণ্ন মুখ। গালে তখনো পতাকার রঙ, অনেকের মাথায় পতাকার ত্রিবর্ণ কেশর।

স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে মিডিয়া সেন্টারের দিকে হাঁটি। পাশে জনস্রোত। স্তব্ধ জনস্রোত। রেলওয়ে স্টেশনে এসেও দেখি, সারি সারি বিষণ্ন মুখ। গালে তখনো পতাকার রঙ, অনেকের মাথায় পতাকার ত্রিবর্ণ কেশর। জার্মানি আসার পর থেকে ডয়চে বানই (জার্মান রেলওয়ে) নিত্যদিনের সঙ্গী। আইস-এ সংক্ষেপিত ইন্টার সিটি এক্সপ্রেসগুলোতে উঠেই দেখেছি, দুই কামরার মাঝখানে ছোট্ট একটা মাঠ। দাগ-টাগ দেওয়া মিনিয়েচার সেই মাঠের কোনোটাতে ১৯৫৪। কোনোটায় ১৯৭৪। কোনোটায় ১৯৯০। জার্মানির তিন বিশ্বকাপ। ’৫৪-তে হেলমুট রান, ’৭৪-এ জার্ড মুলার, ’৯০-এ ব্রেমা—জয়সূচক গোল তিনটি কীভাবে হয়েছিল, তার গ্রাফিক বর্ণনা। কোলনের ট্রেনের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ঘুরেও সেগুলো আর দেখি না। এত তাড়াতাড়ি সরিয়ে ফেলা হয়েছে! নাকি এই ট্রেনটাতে ছিলই না!

এর আগে জার্মানির যে তিনটি ম্যাচ দেখেছি, ম্যাচশেষে ট্রেনে শুনতে শুনতে ‘আমরা যাব বার্লিন’ গানের জার্মান রূপটাও প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে। এদিন ভিড় গিজগিজে ট্রেনেও অদ্ভুত এক নীরবতা। উল্টো দিকের সিটে মূর্তির মতো বসে এক জার্মান তরুণ। কোলনের কাছাকাছি এসে যেচে কথা বলি। ক্রীড়াবিজ্ঞানের ছাত্র বার্নড স্মাইকার বলেন, এই দলের কাছে আমরা তো এতটা আশাই করিনি। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের শেষ মিনিটে গোল খেয়ে হারাটা কীভাবে মানব!

পরশু রাতে বার্লিনের ব্রান্ডেনবুর্গ গেটে নয় লাখ লোক একসঙ্গে খেলা দেখেছে। রাত ৩টায় কোলনে নেমে হোটেলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের কথা ভাবি। নয় লাখ লোকের একটা জমায়েত একসঙ্গে দীর্ঘশ্বাস ফেললে তা কেমন হয়!