অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে শুরুটা যেমন হলো, তাতে এর পর থেকে ম্যাচের আগে মাঠ না দেখাটা নিয়ম বানিয়ে ফেলতে পারে বাংলাদেশ দল! গত পরশু লন্ডন থেকে কার্ডিফ পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ দল আর মাঠেই আসেনি। যেকোনো মাঠ প্রথম দেখার মধ্যে একটা রোমাঞ্চ থাকে। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সেই রোমাঞ্চের সঙ্গে পরিচয় হলো কাল ম্যাচের দিন সকালে।

বাংলাদেশের সাংবাদিকদের পরিচয় হলো চমকের সঙ্গে। আগের দিন অধিনায়ক হাবিবুল বাশার জানিয়েছিলেন, প্রথম ম্যাচের ১২ জনই অপরিবর্তিত থাকছে দ্বিতীয় ম্যাচেও। অথচ ১২ জনের বাইরে থাকা তাপস বৈশ্য যে খেলছেন! আগের দিন প্র্যাকটিস হয়নি বলে খেলা শুরুর প্রায় আড়াই ঘণ্টা আগেই মাঠে চলে এসেছে বাংলাদেশ দল। প্র্যাকটিসে তাপস বৈশ্যকে তেড়েফুঁড়ে বল করতে দেখেই কি তাহলে একাদশ বদলে ফেললেন ডেভ হোয়াটমোর? তা নয়, আসল কারণ উইকেট। সোফিয়া গার্ডেনের পাশেই টাফ নদী, এখানকার উইকেট তাই সব সময়ই সকালে অন্তত ঘণ্টাখানেক পেসারদের ভালো বন্ধু হয়ে থাকে। ল্যাঙ্কাশায়ারের কোচ হিসেবে এই মাঠের সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল হোয়াটমোরের। এটি তাই তাঁর অজানা থাকার কথা নয়।

ডেভ হোয়াটমোর জানালেন, ইতিহাস নয়, উইকেট দেখেই তাপসকে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম ম্যাচের দল থেকে বাদ পড়েছেন খালেদ মাহমুদ। তা তাপস না খেললেও বাদ পড়তেন তিনি। মানজারুল ইসলামকে খেলানোর সিদ্ধান্ত একরকম চূড়ান্তই হয়ে গিয়েছিল। ‘সকালে এসে উইকেট দেখে একটু ভেজা-ভেজা মনে হয়েছে। এ কারণেই দুই স্পিনার খেলানোর আর যুক্তি খুঁজে পাইনি। টসে জিতলে আমরা বোলিং করতাম। হেরেও অবশ্য সেই বোলিংই করছি। তাপসকে দলে নেওয়ার কারণ উইকেট’— কাল সকালে খেলা শুরুর মিনিট দশেক আগে ড্রেসিংরুমের নিচে দাঁড়িয়ে বললেন হোয়াটমোর।


১০ ওভারে ৬৯ রান দিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে খরুচে বোলার তাপস বৈশ্য। আবার ৩ উইকেট নিয়ে সফলতমও। 

১০ ওভারে ৬৯ রান দিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে খরুচে বোলার তাপস। আবার ৩ উইকেট নিয়ে সফলতমও। ওভার প্রতি প্রায় ৭ করে রান দেওয়ার পরও উইকেট পেয়েছেন বলে হোয়াটমোরের সিদ্ধান্ত নিয়ে সেভাবে প্রশ্ন তোলা যাচ্ছে না। ৪টি উইকেটই হতো তাপসের, নিছক দুর্ভাগ্যের কারণেই পাননি হেইডেনের উইকেটটি। প্রান্ত বদল করে দ্বিতীয় স্পেল করতে এসে পর পর দু বলে ছয় আর চার খাওয়ার পরের বলেই হেইডেনকে আউট করে উল্লাসে মেতে উঠেছিলেন তাপস। মিড অফে ক্যাচটি নিয়ে মোহাম্মদ রফিক কিন্তু নিশ্চল দাঁড়িয়ে ছিলেন। আম্পায়ার বিলি বাউডেনের প্রসারিত হাতটি যে ঠিকই দেখেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩ উইকেট অবশ্যই বলার মতো পারফরম্যান্স, তবে দিনশেষে পেছন ফিরে তাকালে তাপস বুঝতে পারবেন, একটু বেশি গতিতে বল করার চেষ্টা না করলে শুধু উইকেট-সংখ্যাই নয়, তাঁর পুরো বোলিং ফিগারটাই বলার মতো হতো।

গ্ল্যামরগনে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে মাইকেল কাসপ্রোভিচ সোফিয়া গার্ডেনের উইকেটকে বর্ণনা করেছিলেন ‘অন দ্য স্লোয়ার অ্যান্ড লোয়ার সাইড’ বলে। কাল খেলা শুরু হওয়ার পর দেখা গেল, এই উইকেটে শট খেলাটাও খুব সহজ নয়। মাঠের বাইরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সার দেওয়া দোকান, বাদামি রঙের উইকেট আর প্রচণ্ড গরম মিলিয়ে ম্যাচটা বাংলাদেশেই হচ্ছে বলে ভুল হতেই পারত! মোহাম্মদ রফিকেরও বোধহয় বাংলাদেশ বলেই মনে হয়েছে। এ কারণেই তাঁর ১০ ওভারে মাত্র ৩১ রান! তাপস এতগুলো উইকেট পেয়েছেন বলেই রক্ষা, নইলে রফিকের পারফরম্যান্স দেখে মানজারুলকে খেলালেই ভালো হতো—এ কথা বলে ফেলতেন অনেকেই। 

শেষ মুহূর্তে তাপসের দলে আসাটা অবশ্যই চমক। তবে বাংলাদেশের চমক অবশ্য শুধু দল নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ৯ রানের মধ্যে গিলক্রিস্ট আর পন্টিংকে ফিরিয়ে দেওয়াটাও চমক, তবে আসল চমকটা তো আগের দিনই দিয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে ম্যাচের আগের দিন বাংলাদেশ প্র্যাকটিস করছে না জেনে অস্ট্রেলীয় সাংবাদিকরা পর্যন্ত চমকে গেলেন। একজন রসিকতা করে বললেন, ‘আমরা সমারসেটের কাছে হেরেছি বলে কি এত অবহেলা!’

ম্যাচের আগের দিন প্র্যাকটিস না করার ব্যাপারে প্রশ্ন করায় হোয়াটমোরের প্রতিক্রিয়া দেখে অবশ্য মনে হলো, ম্যাচের আগের দিন প্র্যাকটিস করাটাই বোধ হয় অস্বাভাবিক। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নামার আগে এটা আদর্শ প্রস্তুতি কি না— জিজ্ঞেস করায় হোয়াটমোরের জবাব, ‘আমি তো কোনো সমস্যা দেখছি না।‘ যে বোলিং ব্যাটিংয়ের চেয়েও বড় দুশ্চিন্তা হয়ে উঠেছিল, তাতে এমন পারফরম্যান্সের পর হোয়াটমোর আরও জোর দিয়েই বলতে পারেন কথাটা।