দুই দলের প্রথম পছন্দের জার্সির রং প্রায় এক। তবে স্পেন-পর্তুগাল সেমিফাইনাল এমন একরঙা নয়, এর গায়ে অনেক রং। এর মধ্যে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো কি এটাই—রিয়াল গোলমেশিন বনাম রিয়াল গোলরক্ষকের লড়াই?

সেস ফ্যাব্রিগাসের কাছে মনে হচ্ছে আরেকটি ‘এল ক্লাসিকো’। ‘এল ক্লাসিকো’ বললেই এ দেশের মানুষ সেটিকে রিয়াল মাদ্রিদ বনাম বার্সেলোনায় অনুবাদ করে নেয়। সামনে রিয়ালের রোনালদো—বার্সেলোনার ফ্যাব্রিগাসও এটাই বুঝিয়েছেন কি না, কে জানে। তবে ‘এল ক্লাসিকো’ মানে তো শুধু রিয়াল-বার্সা নয়, এটা ‘দ্য ক্লাসিক’-এর লাতিন বা দক্ষিণী প্রতিরূপ। লাতিন আমেরিকার সব দেশের ফুটবলেই ‘এল ক্লাসিকো’ আছে। আর্জেন্টিনায় ‘এল ক্লাসিকো’ বললে লোকে যেমন রিয়াল-বার্সা বুঝবে না, বুঝবে রিভার প্লেট-বোকা জুনিয়র্স। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মানেও তো ‘এল ক্লাসিকো’। আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ে ম্যাচেও আকছার এর ব্যবহার।

লাতিন আমেরিকার মতো লাতিন ইউরোপ কথাটা সেভাবে প্রচলিত নয়। তবে ইউরোপেও উত্তর-দক্ষিণ আছে। অন্য আরও সব পার্থক্যের মতো ফুটবলেও উত্তর ইউরোপের চেয়ে ভিন্ন এক ঘরানা হয়েই আছে লাতিন ইউরোপ। সেই লাতিন বা দক্ষিণ ইউরোপের প্রতিবেশী দুই দেশ স্পেন ও পর্তুগালের ম্যাচ এমনিতেও ‘এল ক্লাসিকো’ নাম পেতেই পারে।

রোনালদো বনাম ক্যাসিয়াসের লড়াইয়ের কথা বলছিলাম। আজকের ম্যাচটি তো আক্ষরিক অর্থেই দুই রিয়াল-সতীর্থের দ্বৈরথ। মাসের পর মাস একই ড্রেসিংরুম, মাঠে আনন্দ-বেদনার সহযাত্রীরা যখন মাঠে প্রবল প্রতিপক্ষ রূপে আবির্ভূত হন, কেমন হয় সেই অনুভূতিটা? পেশাদার মনে আবেগের ছোঁয়া কমই লাগে, কিন্তু একেবারেই কি লাগে না!

গত রোববার রাতে ইতালি-ইংল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনালের অসংখ্য টুকরো ছবির মধ্যে মনে গেঁথে আছে একটা ছবি। টাইব্রেকারে শট নিতে যাচ্ছেন ইতালিয়ান মারিও বালোতেল্লি। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটা হাসির রেখা। গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ানো ইংলিশ কিপার জো হার্টের ঠোঁটেও মুহূর্তের জন্য সেটির প্রত্যুত্তর। ম্যানচেস্টার সিটির জার্সি গায়ে উথালপাথাল আবেগময় এক মৌসুমের হাজারো স্মৃতি কি তখন উড়ে বেড়াচ্ছিল বালোতেল্লি-হার্টের মনে?

উড়ে বেড়ালেও সেটি ওই ঠোঁটে ফুটে উঠে মিলিয়ে যাওয়া ওই হাসির মতোই ক্ষণস্থায়ী। পেশাদারের বড় দায়। হার্টকে পরাস্ত করেই বালোতেল্লি তাই উল্লাসে মেতে ওঠেন। আজ স্পেনের জালে বল পাঠাতে পারলে রোনালদোই কি আর বন্ধু ক্যাসিয়াসের মনঃকষ্টের কথা ভাববেন নাকি!

রিয়াল-বার্সা ম্যাচের ছায়া এই ম্যাচে পড়তেই পারে। স্পেন তো বলতে গেলে রিয়াল-বার্সা সম্মিলিত একাদশ। পর্তুগাল দলেও রিয়ালের তিনজন। তার পরও এটি রিয়াল-বার্সা নয়। লিওনেল মেসি যে নেই! দেখুন কাণ্ড, ইউরোর সেমিফাইনাল, এখানে আবার মেসিকে নিয়ে টানাটানি!

কিন্তু এই স্পেনের খেলা দেখতে দেখতে মাঝে মধ্যেই যে মেসির কথা মনে হচ্ছে! কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক আপাদমস্তক মাদ্রিদিস্তা। প্রথম একাদশে রিয়াল-বার্সেলোনার প্রতিনিধিত্ব প্রায় সমান-সমান। তার পরও স্পেন যেন জার্সি বদলে বার্সেলোনাই। সেই টিকি-টাকা, পাসের পর পাস খেলে বলের দখল রাখা...কিন্তু এই ইউরোতে কখনো কখনো ‘অকারণ’ পাসের খেলা একটু একঘেয়েই লাগতে শুরু করেছে। কারণ হয়তো ওই মেসিই। এই খেলাটা খেলতে খেলতেই বার্সেলোনা হঠাত্ চোখ ঝলসে দেয় মেসির জাদুতে। এই স্পেনে সেই ঝলকেরই যেন অভাব। ভিয়ার অভাবটাও খুব চোখে পড়ছে। আরে, এ-ও তো সেই বার্সেলোনারই! স্পেন মানে কি তবে মেসি-ভিয়াবিহীন বার্সা? ভাগ্যিস, ক্যাসিয়াস-রামোস-আলোনসোদের এই লেখা পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই!

ডেভিড ভিয়া নেই বলে দেল বস্ক আদ্যন্ত স্ট্রাইকার ছাড়াই দল নামাচ্ছেন। প্রথাগত উইঙ্গার ছাড়াই ১৯৬৬ বিশ্বকাপ জয়ের পর আলফ র্যামসের ইংল্যান্ড দলের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘উইংলেস ওয়ান্ডার’। দেল বস্ক সেমিফাইনাল-ফাইনালেও স্ট্রাইকার ছাড়া প্রথম একাদশ নামিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলে এই স্পেন দলকে কি ‘স্ট্রাইকারলেস ওয়ান্ডার’ নামে ডাকা হবে?

গোল-খরা অবশ্য এই স্পেনের চিরন্তন সমস্যা। ২০০৮ ইউরো থেকে শুরু করে গত ১৭ ম্যাচের ১৪টিতেই জয়, অথচ গোল মাত্র ২৮টি। সাতটি ম্যাচে একটির বেশি গোল নেই। এভাবে কি পার পাওয়া যাবে প্রতিদিন? চিরদিনের অতৃপ্ত স্পেনের ফুটবলে নতুন যুগের সূচনা গত ইউরো জিতেই। কে জানে, আরেকটি ইউরো সেটির সমাপ্তি ঘোষণার মঞ্চ হয়ে থাকবে কি না!

সেটি হতে পারে রোনালদোর পায়ে বা মাথায় (এই একটা জায়গায় মেসির চেয়ে অনেক এগিয়ে তাঁর পর্তুগিজ প্রতিদ্বন্দ্বী)। দুই রোনালদো খেলেছেন এবারের ইউরোতে। প্রথম দুই ম্যাচে যেন খেলতে নেমেছিলেন ‘দেখো, কতভাবে মিস করা যায়’ শীর্ষক প্রদর্শনীর চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরের দুই ম্যাচে পর্তুগালের রোনালদো দেখা দিলেন রিয়ালের রোনালদো রূপে। প্রতিপক্ষ সমর্থকদের ‘মেসি’ ‘মেসি’  বলে উত্ত্যক্ত করাটাই কি তাঁকে জাগিয়ে তুলল এমন!