অঝোরে কাঁদছেন মুশফিকুর রহিম। অধিনায়ককে বুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন সাকিব আল হাসান। ঠোঁটে অদ্ভুত একটা হাসির রেখা। চিকচিক করতে থাকা চোখ আর ওই হাসি মিলিয়ে এমন একটা বেদনার্ত ছবি, যা হৃদয়কে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়।

একটু আগেও প্রাণোচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা মিরপুর স্টেডিয়ামে তখন শ্মশানের নীরবতা। সারি সারি শোকস্তব্ধ মুখ। এত কাছে, তবু এত দূর...!

মিরপুরে তো মাত্র হাজার পঁচিশেক দর্শক। পুরো দেশই তো কাল ‘মিরপুর’! বিজয়োৎসবে মেতে ওঠার অপেক্ষায় প্রতিটি প্রহর গোনা। উল্টো মুশফিকের কান্না ছোঁয়াচে হয়ে ভিজিয়ে দিল কোটি কোটি চোখ। স্বপ্নের মৃত্যু এমন কষ্ট হয়েই বাজে বুকে!

প্রায় শূন্য সেই গ্যালারির ওপর আতশবাজি নেচে নেচে বেড়ায় আর অনুচ্চারে বলতে থাকে, স্বপ্ন আর বাস্তব জীবনে খুব কমই মেলে!

পুরস্কার বিতরণী শেষে হঠাৎ মিরপুরের সব আলো নিভে যায়। মাঠে লেজারের আলো পড়ে। আকাশে শুরু হয় আতশবাজির খেলা। বাংলাদেশ জিতলে গ্যালারি তখনো পূর্ণই থাকত। হেরেছে বলে সেটি তখন ভাঙা হাট। প্রায় শূন্য সেই গ্যালারির ওপর আতশবাজি নেচে নেচে বেড়ায় আর অনুচ্চারে বলতে থাকে, স্বপ্ন আর বাস্তব জীবনে খুব কমই মেলে!

আবেগকে নির্বাসনে পাঠিয়ে শুধু ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখলে কী দুর্দান্ত একটা ফাইনালই না হলো! শেষ বলে নিষ্পত্তি। যে বলে বাংলাদেশের দরকার চারটি রান! কিন্তু হায়! উইকেটে তখন ১০ নম্বর ব্যাটসম্যান শাহাদাত হোসেন। তা হোক, ব্যাটের কানায়-টানায় লেগেও তো কত চার হয়ে যায়! হলো না। হলো মাত্র এক রান। মাহমুদউল্লাহ হতাশায় বসে পড়লেন মাঠে। চোখে অবিশ্বাস নিয়ে বিমূঢ় তাকিয়ে দর্শকেরা। হঠাৎ নেমে আসা স্তব্ধতায় মিরপুর স্টেডয়াম যেন এক প্রেতপুরী।

শেষ ১০ ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৮৪ রানের। শেষ ৫ ওভারে ৪৭। ৪৭তম ওভারে ১৪ রানে হঠাৎই সমীকরণটা অনেক সহজ—শেষ ৩ ওভারে ২৫ রান। হতে হতেও যা হলো না। ৮ বলে ১৮ করে ফেলার পর মাশরাফির আউটটাকে তখন মনে হতে থাকল অনেক বড়! আফসোস হয়ে আরও কত ‘যদি’-ই না তখন উড়ে বেড়াচ্ছে বাতাসে! ইশ্, তামিম যদি আর চারটা ওভার থাকতেন অথবা সাকিব! সাকিব আউট হওয়ার দুই বল পরই যদি মুশফিক আউট হয়ে না যেতেন! ডিপ মিড উইকেটে ক্যাচ হওয়ার বদলে ছয়ও তো হয়ে যেতে পারত ওই শটটি! তা হলেই তো হয়ে যায়!

হয়ে যায় নাজিমউদ্দিন ৫২ বলে ১৬ রানের ওই অতিপ্রাকৃত ইনিংসটি না খেললে! অথবা নাসির ২৮ রান করতে ৬৩ বল লাগিয়ে না ফেললে! আরেকটু পিছিয়েও গেল অনেকের মন—শাহাদাত শেষ ওভারে এসে অমন দানছত্র খুলে না বসলেও তো হতো। শেষ ওভারে দুটি নো বলসহ ১৯ রান। ম্যাচের ময়নাতদন্তে সেটিই হয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের চৌকাঠ থেকে বাংলাদেশের শূন্য হাতে ফিরে আসার কারণ।

সাকিব বরাবরের মতোই দুর্দান্ত। বাংলাদেশ ৩ উইকেটে ৮১ হয়ে যাওয়ার পর নেমে ৭২ বলে ৬৮। এর আগে বোলিংয়ে ২ উইকেট। এশিয়ার বাকি তিন পরাশক্তির কত বড় বড় তারাকে মিটমিটে করে দিয়ে টুর্নামেন্ট-সেরার আলোয় উদ্ভাসিত বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে দামি অলংকার।

তামিমের ব্যাট থেকে টানা চতুর্থ ম্যাচে পঞ্চাশ পেরোনো ইনিংস। ব্যাটিংয়ের মতো তাঁর উদযাপনেও অনেক উদ্ভাবনী ব্যাপার থাকে। কাল যেমন হাফ সেঞ্চুরি করার পর এক এক করে হাতের চারটি আঙুল দেখিয়ে মনে করিয়ে দিলেন, টুর্নামেন্টের চার ম্যাচে এটি তাঁর চতুর্থ ফিফটি। সঙ্গে কি এটাও নয় যে, এশিয়া কাপের দল থেকে তাঁকে বাদই দিয়ে দিয়েছিলেন বোর্ড সভাপতি!

ফাইনাল জিতলে ট্রফি নিয়ে উদযাপনটাও হয়তো ভেবে রেখেছিলেন। কিন্তু সেটি আর দেখা হলো কই! শেষে এসে যে চোখের জলেই স্বপ্নের সমাধি। অথচ ফাইনালটা শুরু থেকেই যেন এগোচ্ছিল বাংলাদেশের পছন্দমতো পাণ্ডুলিপি মেনে। আগের দুই ম্যাচে রান তাড়া করে জয়। জয়ের পাপড়ি ছড়ানো পথেই যাত্রা শুরু করতে টস জেতাটা খুব জরুরি ছিল। মুশফিকুর ঠিকই জিতলেন। টুর্নামেন্টে টানা চতুর্থ ম্যাচে।

বড় ভয় ছিল ‘ফাইনাল’ শব্দটা না বিষম বোঝা হয়ে চেপে বসে মুশফিকুরদের কাঁধে। সেই ভয়ও উধাও উজ্জীবিত বোলিং-ফিল্ডিংয়ে। একটু পরপরই তাই ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ চিৎকারে গলা ফাটানোর সুযোগ পেল দর্শকেরা। দেখতে দেখতে ৩৫তম ওভারে পাকিস্তান ৬ উইকেটে ১৩৩।

এর পরও ভয় হয়ে ছিলেন শহীদ আফ্রিদি। টুর্নামেন্টে শুধু নামেই ‘বুম বুম’, আজ কিছু করে ফেলবেন না তো! সরফরাজের সঙ্গে আফ্রিদির জুটিটি জমেও গেল। কিন্তু সংশয়ে-বিপদে বাংলাদেশের উদ্ধারকর্তা হয়ে সাকিব আল হাসান আছেন না! আফ্রিদিকে ফেরালেন তিনি। লং অফে নাসিরের দুর্দান্ত ক্যাচে আবারও যেন ঘোষণা—‘হবে, আজও হবে।’ যদিও সরফরাজের ৫২ বলে অপরাজিত ৪৬, শেষ উইকেট-জুটিতে ৩০ রান আর শাহাদাতের শেষ ওভার মিলিয়ে ইনিংসের শেষে মনে একটা খচখচে অনুভূতি।

তার পরও এই উইকেটে ২৩৬ কোনো রান হলো! মাত্র কদিন আগেই না ২৮৯ তাড়া করে জিতেছে বাংলাদেশ! কিন্তু ক্রিকেট-দেবতা যে এই রাতটি অন্যভাবে লিখে রেখেছিলেন। যে রাতে বাংলাদেশ স্বপ্ন ছুঁতে ছুঁতে হারিয়ে ফেলবে!