এডি বারলোর যে ছবিটা বাংলাদেশের মানুষের মনে গেঁথে আছে, তাতে তিনি কাঁদছেন। ব্রেন স্ট্রোকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বারলোর মন চাইছে, কিন্তু শরীর পারছে না। বাধ্য হয়েই তার সঙ্গে বিচ্ছেদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে। হুইল চেয়ারে বন্দি বারলোর কান্নায় শোকবিধুর হয়ে ওঠা সেই সংবাদ সম্মেলনটার কথা তুললে এখনো অনেকে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন।

চার বছর পর আবার এডি বারলোকে কাঁদতে দেখলাম। আবেগের সবচেয়ে নির্ভেজাল প্রকাশের নাম কান্না, আর বাংলাদেশ তাঁর কাছে এমনই এক আবেগের নাম যে, বারলোর মনেই থাকে না পেশাদার কোচ হিসেবে মাত্র বছর দুয়েক এই দেশটিতে ছিলেন তিনি। পেশাদারদের নাকি আবেগ স্পর্শ করে না, অথচ বাংলাদেশের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে বারলোর দু চোখ জলে ভরে যায়! ‘বাংলাদেশ’ নামটি শুনলেই রক্তে অদ্ভুত একটা নাচন অনুভব করেন, যে কারণে বাংলাদেশের খেলা দেখতে অসুস্থ শরীরে ছুটে আসেন মাঠে। লর্ডস টেস্টে এসেছিলেন। গত পরশু ২০০ মাইল দূর থেকে ছুটে এলেন ডার্বিতেও।

দুটোই তাঁর দল। অনেক দিন ডার্বিশায়ারে খেলেছেন, টানা তিন বছর ছিলেন অধিনায়ক। আগামী বছর তার ডার্বিশায়ারে আগমনের ত্রিশ বছর পূর্ণ হবে, সাবেক খেলোয়াড়দের মিলনমেলায় বারলোকে বিশেষ সম্মাননাও দেবে ডার্বিশায়ার। কিন্তু গত পরশু ম্যাচের পুরোটা সময় বারলো ডার্বিশায়ারের অমঙ্গলই কামনা করে গেলেন। ডার্বিশায়ার জীবনের একটা বড় অংশ হতে পারে, বাংলাদেশ যে তাঁর জীবনই!


‘সারাক্ষণ আমি শুধু ভাবি, আবার যদি বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারতাম। এটাই আমার জীবনের স্বপ্ন’— বলতে বলতে বারলোর দু চোখ চিকচিক করে ওঠে। গুলশানে রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, ছোট্ট একটা ছেলে তাঁকে এসে বলল, আপনি আমার পিঠে উঠুন। ‘এতটুকু একটা ছেলে, একটা পালক বইবারও ক্ষমতা নেই। কতটা ভালোবাসলে সে আমাকে বলে, পিঠে উঠুন’—আপাত তুচ্ছ এই গল্প বলার সময় আবেগে কাঁপতে থাকে বারলোর কণ্ঠ, চিকচিক করতে থাকা দু চোখ আস্তে আস্তে জলে ভরে যায়।

ডার্বিশায়ার মাঠের হসপিটালিটি বক্সে দুই চেয়ার দূরে বসে থাকা তার স্ত্রী কেলি জানান, তাঁরা এক-এক পেনি করে সঞ্চয় করছেন, শুধু আরেকবার বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য। বাংলাদেশের খেলা থাকলেই বারলো কেমন অস্থির হয়ে ওঠেন, জানান তা-ও। ‘কোথাও বাংলাদেশের খেলা থাকলেই হলো, ইন্টারনেটে গিয়ে সর্বশেষ স্কোরটা জানানোর জন্য বারবার তাগাদা দেয় ও’—কেলির কণ্ঠে অনুযোগ নয়, বরং আনন্দ। বাংলাদেশে কাটানো দুটি বছর যে তাঁর জীবনেরও স্মরণীয় এক অধ্যায়। বারলোর সঙ্গে যখন কথা বলছি, প্রায় পুরোটা সময় ডার্বিশায়ারের এক কর্তাব্যক্তিকে কেলি প্রাণপণে বুঝিয়ে যাচ্ছেন, কেন বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই উচিত নয়। বুঝিয়ে যাচ্ছেন, এটি কী বিপুল সম্ভাবনার দেশ! কণ্ঠে কিশোরীসুলভ উত্তেজনা নিয়ে বলছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতার গল্প। ঘণ্টা-তিনেক পর ডার্বিশায়ার যখন জয়ের পথে এগোচ্ছে, কেলি তখন মাঠের চারপাশে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, আবার দেখা হয়ে যেতেই বলছেন, ‘আমি হাঁটতে শুরু করতেই একটি উইকেট পড়েছে। এ জন্য আর বসছি না।’


বাংলাদেশকে নিয়ে বারলো দম্পতির আবেগের প্রকাশ এমনই তীব্র যে, তা বিস্ময়ের ঘোর জাগাতে বাধ্য। কী এমন দেখেছেন বাংলাদেশে? দুজনই সমস্বরে বলছেন, ‘ওয়ান্ডারফুল পিপল! এত ভালো মানুষ আমরা আর কোথাও দেখিনি।’বাংলাদেশের সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যেন বারবার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ফিরে গেলেন বারলো, গুলশানে যে রিকশাওয়ালা তার কাছ থেকে ভাড়া নিতে চায়নি, তাঁর মুখটাও যেন স্পষ্ট দেখতে পেলেন চোখের সামনে। রকিবুল হাসান এখন কী করছেন জানতে চাইলেন, জানতে চাইলেন সাবের হোসেন চৌধুরীর কথা। বাংলাদেশে তাঁর সময়টায় প্রধান নির্বাচকের দায়িত্ব পালন করা তানভীর হায়দার যে মারা গেছেন, জেনেছেন আগেই। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বারলোর মুখে এক চিলতে হাসি, ‘আমার দেখা সবচেয়ে মজার মানুষ। সাবের ভাইয়ের বিপক্ষে ইলেকশনে দাঁড়িয়ে গেলেন! চিন্তা করো ব্যাপারটা, সাবের ভাইয়ের বিপক্ষে ইলেকশন!’ 

মাঠে জাভেদ ওমরকে দেখিয়ে বললেন, ‘ও ম্যাচের আগের দিন আমাকে ফোন করে বলত, আমি একজন সাংবাদিক, কালকের ম্যাচের দলটা বলবেন!’স্মৃতির অ্যালবামের একেকটা পাতা উল্টাচ্ছেন আর রেকর্ড করা কথার মতো বলে যাচ্ছেন, ‘আবার আমার বাংলাদেশে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে।’


আপাতত বাংলাদেশে নয়, ম্যাচশেষে বারলো ফিরে গেলেন রেেম। ডার্বি থেকে ২০০ মাইল দূরের এই ছোট্ট শহরে কেলির মায়ের বাড়িতে এখন বারলো দম্পতির বাস। বারলোর শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো, লাঠিতে ভর দিয়ে মোটামুটি চলাফেরা করতে পারেন। একটি ক্লাবকে সপ্তাহে তিন দিন কোচিংও করান। গত পরশু ছিল সেই তিন দিনের এক দিন। বারলো বলে দিয়েছেন, ‘এদিন আমি বাংলাদেশের খেলা দেখব। কোচিং-টোচিং করাতে পারব না।’আগামী ২৫ জুন ম্যানচেস্টারে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ম্যাচটিও দেখবেন বলে ঠিক করে রেখেছেন। বারলোর কথা শুনে মনে হওয়া স্বাভাবিক, অন্য ম্যাচগুলো দেখতে পারছেন না বলে তাঁর আফসোসের সীমা নেই। 

টেস্ট স্ট্যাটাসের পথে বাংলাদেশের যাত্রাপথের রূপরেখা তাঁরই তৈরি করে দেওয়া। শুধু এ কারণেই বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাসের প্রবল সমর্থক নন; বারলো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, একদিন বাংলাদেশ হবে এক ক্রিকেট পরাশক্তির নাম। কিছু শর্তপূরণের ব্যাপার তো আছেই, তবে বারলোর চোখে সবচেয়ে বড় যে শর্ত, সেটির নাম ‘ধৈর্য’। ‘এটা চটজলদি করে ফেলার মতো ব্যাপার নয়। সময় লাগবে, ধৈর্য ধরতে হবে। এই যে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা বেশি শট খেলে আউট হয়ে যাচ্ছে, তাঁরা কতটা ভালো তা দেখাতে বেশি উদগ্রীব হয়ে থাকাটাই এর কারণ।’ সুযোগ পেলেই টেলিভিশনে বাংলাদেশের খেলা দেখেন। টেলিভিশনেই প্রথম দেখেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা আর তাপস বৈশ্যকে, দুজনকেই খুব মনে ধরেছে তাঁর, ‘ওরা দুজনই বেশ জোরে বল করে। ভালো একটা পেয়ার হতে পারে ওরা। আমার সময়ে তো মোটামুটি জোরে বল করতে পারে, এমন কেউই ছিল না দলে।’

তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য বাংলাদেশের সাংবাদিকদের লম্বা লাইন। তাঁদের একজনকে জায়গা ছেড়ে দিতে বিদায় নেওয়ার জন্য হাত মেলাচ্ছি, বারলো বললেন, ‘আবার দেখা হবে’। তারপর হাতটি মুঠোয় রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে প্রায় ফিসফিস করে নিজেই যেন নিজেকে বললেন, ‘আমি বাংলাদেশে যাবই।’