খেলায় বিরতি? দুই ওভারের মাঝখানে একটু চোখের আরাম চাই? মাথা ঘোরানোরও প্রয়োজন নেই। দুই চোখ একটু ডানে ঘোরালেই সাগর!

গলের এই মাঠ বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ক্রিকেট মাঠের লড়াইয়ে অ্যাডিলেড ওভাল ও কেপটাউনের নিউল্যান্ডসের প্রতিদ্বন্দ্বী। সেই তর্কে না-ই গেলাম। আমি শুধু সাংবাদিকের দৃষ্টিকোণ থেকেই বলি। মাঠে সাংবাদিকের ‘বাড়িঘর’ হলো প্রেসবক্স। প্রতিদিন প্রায় ১২ ঘণ্টা যে এখানেই কাটে। সেই প্রেসবক্সে বসে সাগর দেখা? এই আনন্দ আর কোথাও পাওয়ার নয়।

স্টেডিয়ামের মূল প্যাভিলিয়নের দুই প্রান্তে দুটি প্রেসবক্স। স্থানীয় ও বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য আলাদা আলাদা। প্রথম দিন অবাকই হয়েছিলাম, একটু বিরক্তও। প্রেসবক্সে বসেই অবশ্য সেটি উধাও। শ্রীলঙ্কানদের প্রেসবক্স থেকে যে সাগরটা এত ভালো দেখা যায় না! সামনে তাকালেই গল দুর্গের ছোপ ছোপ পাথুরে দেয়াল। যেন কয়েক শ বছরের ইতিহাস ছড়িয়ে আছে সেটির গায়ে। ডানেই সাগর। প্রেসবক্সের উচ্চতাটাও খেলা দেখার জন্য একেবারে আদর্শ। সব মিলিয়ে খেলা কাভার করার জন্য আমার প্রিয় মাঠের তালিকার একেবারে ওপরের দিকে জায়গা করে নিল গলের এই মাঠ। 

এখানে কাভার করা এই প্রথম টেস্ট ম্যাচটা সাংবাদিকতা জীবনে বড় একটা শিক্ষাও হয়ে থাকল। ক্রিকেটের গৌরবময় অনিশ্চয়তা বোঝাতে ‘ফানি গেম’ কথাটা খুব প্রচলিত। যেকোনো কিছু লেখার সময় এটা আমি খুব মাথায় রাখি। ‘সম্ভবত’ শব্দটা এ ক্ষেত্রে বড় সহায় হয়ে আসে। কখনো না বা ‘অলৌকিক কিছু না ঘটলে’ শব্দবন্ধ।

অথচ এখানে শ্রীলঙ্কা ৫৭০ রান করে ছেড়ে দেওয়ার পর অবলীলায় লিখে দিলাম, ‘এই টেস্টে শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংস দেখার সম্ভাবনা আর বাংলাদেশে হরতাল উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় সমান।’ বাংলাদেশ ৬৩৮ করে ফেলার পর কথাটা কী হাস্যকরই না মনে হচ্ছে!

পাঠকের স্মৃতিশক্তি খুব প্রখর। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল নিয়ে সমর্থকদের আবেগও বড় চড়া তারে বাঁধা। তৃতীয় দিনে আশরাফুল-মুশফিকের ওই কীর্তির আগেই লেখার ওই অংশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন অনেক পাঠক। ওই কীর্তির পর তো আমার ফেসবুক পেজের ওপর দিয়ে মোটামুটি একটা ঝড়ই বয়ে গেছে। ভুল যখন প্রমাণিতই হয়েছি, কী আর করা, ক্ষমা-টমাও চাইতে হলো।

কিন্তু যে দল ৬৩৮ করে ফেলেছে, তারা ৩৭০ করতে পারবে না বলে কেন অমন নিঃসন্দেহ হয়ে গিয়েছিলাম? দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে ওই লেখার সময়টায় যখন ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি নিজেকে, এই প্রশ্নের উত্তর পেতে একটুও সমস্যা হচ্ছে না। সাংবাদিক হিসেবে কোনো পূর্বাভাস দেওয়া বা ভবিষ্যদ্বাণী করার ব্যাপারটা পুরোপুরিই ইতিহাস আর পূর্বাভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানেও সেটিই ছিল অমন নৈরাশ্যবাদী হয়ে যাওয়ার মূলে। কীভাবে জানব, গলের উইকেট এমন ভোল পাল্টে ফেলবে!

গলের এই উইকেট চিরদিনই স্পিনারদের স্বর্গরাজ্য। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কান স্পিনারদের। সুনামির ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্জন্ম হওয়ার পর এই মাঠে যে ৯টি টেস্ট হয়েছে, তার কোনোটিতেই অতিথি কোনো দল ৩৭০ (বাংলাদেশের ফলো অন এড়ানোর টার্গেট) করতে পারেনি। সর্বশেষ টেস্টে তো দুই ইনিংসে ২২১ ও ১১৮ রানে অলআউট হয়ে তিন দিনে হেরেছে নিউজিল্যান্ড। ঠিক আছে, নিউজিল্যান্ড না হয় স্পিন খেলতে পারে না! কিন্তু অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, ভারত, ইংল্যান্ড—এদেরও তো একই দশা। স্পিন খেলায় এত ভালো ভারতকেও এখানে খেলা সর্বশেষ টেস্টে ফলো অন করতে হয়েছে। ফলো অন এড়াতে কত করতে হতো, জানেন? বাংলাদেশের চেয়ে ৫০ রান কম!

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে আমার ক্রিকেটজ্ঞান নিয়ে। প্রথম দুই দিনের খেলা দেখেও কেন বুঝলাম না, এটি গলের সেই চিরন্তন উইকেট নয়! ভাই রে, আমি কী বুঝব, এই মাঠে সব টেস্ট কাভার করা শ্রীলঙ্কান সাংবাদিকেরাই তো বোঝেননি। সবাই তো বলছিলেন, প্রথম দুই দিন একটু অন্য রকম লাগলেও গলের উইকেট বলে কথা! তৃতীয় দিন থেকেই বল বাই বাই ঘুরতে শুরু করবে। কাল চতুর্থ দিনের খেলার পর শ্রীলঙ্কার এক সাংবাদিক বললেন, ‘আজ যা দেখলে, সেটি আসলে গলের প্রথম দিনের উইকেট!’ 

এখন মনে হচ্ছে, জয়ানন্দ বর্ণবীরার কথা বিশ্বাস করলেই হতো। টেস্ট শুরুর আগেই এই মাঠের কিউরেটর দিব্যি কেটে বলছিলেন, এটি গলের সেই চিরন্তন উইকেট নয়। এই উইকেট রানে ভরা। কাল দুপুরে জানালেন, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসকে তিনি বারবার বলেছেন এত তাড়াতাড়ি ছেড়ো না, এই উইকেটে বাংলাদেশ কমপক্ষে ৩৫০ করবে। 

বাংলাদেশকে নিয়ে বর্ণবীরার কল্পনাও ৩৫০-এর বেশি ছুঁতে পারেনি। সেখানে ৬৩৮? অবিশ্বাস্য বললেও কি কম বলা হয়ে যায়! ম্যাথুসের মাথায় নিশ্চয়ই শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের অতীত রেকর্ড ছিল। আগের আট টেস্টে এমন ব্যাটিং উইকেট কি কখনো পায়নি বাংলাদেশ! তার পরও ১৬ ইনিংসে মাত্র একবারই তিন শ পেরিয়েছে স্কোর। দুই শর বেশি স্কোরই তো মাত্র দুটি।

শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের অতীত আর গলের উইকেটের ইতিহাস মিলিয়ে আমিও নিঃসন্দেহ হয়ে গিয়েছিলাম, ইনিংস পরাজয়ই এখানে ভবিতব্য। কারণ যেটিই হোক, বাংলাদেশ দল আমাকে গর্দভ বানিয়ে ছেড়েছে। সান্ত্বনা একটাই—এমন ভুল করলে গুনগুন করে গাওয়া যায়, ‘ভুল যদি হয় মধুর এমন হোক না ভুল।’