কান্নাকাটি যা হওয়ার ম্যাচের সময়ই হয়ে গেছে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে প্রথর্মাধেই। এর পর ব্রাজিলিয়ানদের দ্রুতই যা আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, তা হলো অবিশ্বাস। সত্যিই কি এমন কিছু হয়েছে! জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হেরেছি আমরা!

গত পরশু রাতের বেলো হরিজন্তেকে দেখে পুরো ব্রাজিলকে অনুমান করতে চাওয়ার চেষ্টাটা কি ঠিক? উত্তরটা ‘হ্যাঁ’-ই হওয়া উচিত। যেখানে এই বিয়োগান্ত নাটকের মঞ্চায়ন, অনুভূতির তীব্রতা তো সেখানেই বেশি হওয়ার কথা। হতাশা, ক্ষোভ, লজ্জা...সবকিছু পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত যে অনুভূতিতে সবাইকে আচ্ছন্ন দেখলাম, তা ওই অবিশ্বাস।

কাল সকালে বেলো হরিজন্তে থেকে সাও পাওলো এসেও সেই একই চিত্র। কারোরই বিশ্বাস হচ্ছে না। আগের রাতে যা হয়ে গেছে, তা যেন একটা দুঃস্বপ্ন। ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর যা নিয়ে রসিকতাও করা যাবে। আসলেই কি এমন কিছু ঘটেছে? শুধু বিশ্বকাপে নয়, ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসেই সবচেয়ে বড় পরাজয়ে শেষ হয়েছে হেক্সার স্বপ্ন! ১৯৭৫ সালের পর দেশের মাটিতে প্রতিযোগিতামূলক কোনো ম্যাচে প্রথম হেরেছে ব্রাজিল!

গত পরশু এস্তাদিও মিনেইরাওয়ে যা হয়েছে, সেটি শুধু ‘পরাজয়’ শব্দটা দিয়ে বোঝানোর উপায় নেই। এর আগে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে কোনো দল সাত গোল করতে পারেনি। সেটিই হলো কি না ব্রাজিলের বিপক্ষে! নিজেদের মাঠে হেক্সা জয়ের স্বপ্ন যখন মাত্র দুই ধাপ দূরে। জার্মানি তাদের নিয়ে এমন ছেলেখেলা করল যে, যেন ব্রাজিল কোনো পাড়ার দল। না, শুধু পরাজয় দিয়ে এটা বোঝানো যায় না।

যত দিন ফুটবল নামে খেলাটা থাকবে, বারবার ঘুরেফিরে আসবে এই ম্যাচ। ফিরে আসবে অবিশ্বাসের ওই অনুভূতি নিয়েই। আসলেই কি অমন হয়েছিল?

সাও পাওলোর সবচেয়ে নামী দৈনিক অনলাইন সংস্করণে শিরোনাম করেছিল: ঐতিহাসিক অপমান। ঐতিহাসিক তো বটেই। এই ম্যাচ কাভার করেছেন, এমন সাংবাদিকদের অনেকে আলাপ করছিলেন বুড়ো বয়সে এই ম্যাচের স্মৃতিচারণা করে কত সাক্ষাৎকারই না দিতে হবে! যত দিন ফুটবল নামে খেলাটা থাকবে, বারবার ঘুরেফিরে আসবে এই ম্যাচ। ফিরে আসবে অবিশ্বাসের ওই অনুভূতি নিয়েই। আসলেই কি অমন হয়েছিল?

ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার তিন ঘণ্টা পরও ভালমিরের যেমন বিশ্বাস হচ্ছিল না। এস্তাদিও মিনেইরাও থেকে হোটেলে আসার পথে মধ্যবয়সী ট্যাক্সিচালক বিচিত্র ইংরেজিতে একটা কথাই দুবার বললেন, ‘আই নট বিলিভ।’ ‘আই নট বিলিভ।’ হোটেলের ২৬ বছর বয়সী রিসেপশনিস্ট। নাম থিয়াগো। ব্রাজিলের অধিনায়ক থিয়াগো সিলভার সঙ্গে নামের মিল নিয়ে আগের দিন রসিকতা করেছেন। এদিন আর রসিকতার মুড নেই। পুরো ম্যাচ দেখেনওনি, ‘পাঁচ গোল হওয়ার পর টেলিভিশন অফ করে দিয়েছি। আর দেখতে পারছিলাম না, অসুস্থ লাগছিল। কীভাবে সম্ভ্রব!’

হোটেলের রিসেপশনের আরেক কর্মী প্যাট্রিসিয়া অনেক চেষ্টা করেও এই ম্যাচের টিকিট পাননি বলে আফসোস করছিলেন আগের দিন। কাল ভোররাতে হোটেল থেকে চেকআউট করার সময় বললেন, ‘ভালো হয়েছে মাঠে যেতে পারিনি। জার্মানির সঙ্গে ব্রাজিল পারবে না ভয় ছিল, কিন্তু তাই বলে ৭-০, ভাবা যায়! বিশ্বাসই হচ্ছে না।’

৭-০ নয় তো, ৭-১। শুনে প্যাট্রিসিয়া বিস্মিত, ‘তাই নাকি! ব্রাজিল একটা গোল করেছে! আমি তো জানিই না। অবশ্য করলেই কী আর না করলেই কী!’


ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় এয়ারলাইনসের নাম ট্যাম। বেলো হরিজন্তে বিমানবন্দরে ট্যামের চেক-ইন কাউন্টারে দেখা মিলল থিয়াগো সিলভা, ডেভিড লুইজ ও মার্সেলোর। অবশ্যই আসল নয়। কার্ডবোর্ডের আপাদমস্তক কাটআউট। প্রথম দুজন হাস্যোজ্জ্বল মুখে আঙুল দিয়ে ট্যামের বিক্রয়কেন্দ্র র্নিদেশ করছেন। মার্সেলো চেক-ইন কাউন্টার। সামনে তরুণ দুই যাত্রী রসিকতা করছিলেন, ‘ডেভিড লুইজ আর র্মাসেলো ডিফেন্সের যে বাহার দেখাল, ওদের দিয়ে বিজ্ঞাপন করালে কেউ আর ট্যাম এয়ারলাইনসে উঠতে সাহস পাবে না।’ বিশ্বকাপ ফুটবল পুরো বিশ্বকেই আসলে একখানে টেনে আনে। ওই দুই তরুণের একজন যেমন গুয়াতেমালার, আরেকজন মরক্কোর।

সাও পাওলোর বিমানে ওঠার লাইনে দাঁড়িয়ে আলাপ হলো ব্রুনো বেনজিয়ার সঙ্গে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়াশোনা করছেন। এই ম্যাচটা দেখতেই কুরিতিবা থেকে বেলো হরিজন্তে এসেছিলেন। প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়ায় বললেন, ‘আমার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তখনো বিশ্বাস হয়নি, এখনো হচ্ছে না। ইতিহাসেই যা কখনো হয়নি, চোখের সামনে তেমন কিছু ঘটতে দেখলে কীভাবে তা হবে!’


সবকিছু অবশ্য ব্রুনোর চোখের সামনে হয়নি। ব্রাজিল দুই গোল খাওয়ার পর বাথরুমে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখেন পাঁচ গোল হয়ে গেছে। ‘বন্ধুবান্ধব নিয়ে খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। ওরা যখন বলল, ব্রাজিল আরও তিন গোল খেয়ে ফেলেছে; আমি ভেবেছি, দুষ্টুমি করছে। আপনিই বলুন, এটা কি বিশ্বাস করার মতো!’

ব্রাজিল দুই গোল খেয়ে ফেলার পরই মাঠের বড় পর্দায় মুখে হলুদ-সবুজ আঁকা ক্রন্দনরত মুখ ভেসে উঠেছে স্টেডিয়ামের বড় পর্দায়। ব্রুনোর কাছে অবশ্য ফুটবল ম্যাচে হারার কারণে কান্নাকাটিকে হাস্যকর মনে হয়। তবে যুক্তিটা জোরালো নয়, ‘আমি কখনো কাঁদিনি। কাঁদার কী আছে? এই ফুটবলাররা কোটি কোটি টাকা আয় করে। আমাদের তো কাজ করেই খেতে হয়।’ 

কিন্তু ফুটবলাররাও তো কাঁদল। এবার রাগটা ফুটে বেরোল, ‘ওদের তো কাঁদাই উচিত।’


সাও পাওলোতে নেমে ও এস্তাদো দ্য সাও পাওলো পত্রিকাটা পেলাম। ওপরে প্যানেল করে হলুদ-সবুজ পাঁচটি ব্রাজিলিয়ান মুখ। কোনোটায় কান্না, কোনোটায় হতাশা, কোনোটায় অবিশ্বাস। নিচে লুইস ফেলিপে স্কলারির বুক পর্যন্ত বড় একটা ছবি। মুখ অবশ্য দেখা যাচ্ছে না, তা দুই হাতে ঢাকা। ওই ছবিটাই যেন ভুতুড়ে এই ম্যাচের পুরো গল্পটা বলে দিচ্ছে।

একাধিকবার বিশ্বকাপজয়ী দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলই কখনো দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জেতেনি। ৬৪ বছর আগে স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল ‘মারাকানাজো’। এবার আর মারাকানা পর্যন্ত যাওয়াই হলো না। ‘মিনেইরাওজো’-তেই শেষ হয়ে গেল সব।

‘মারাকানাজো’তে দুঃখ ছিল, লজ্জা ছিল না। এখানে দুটিই আছে। ও এস্তাদো দ্য সাও পাওলোর প্রথম পাতার মূল শিরোনামটাই ব্রাজিলের ২০১৪ বিশ্বকাপ। হিউমিলিহাসাও এম কাসা।

নিজের ঘরে অপদস্থ!